কেমন আছি আমরা মফস্বলের সাংবাদিকরা?-

প্রকাশিত: ১২:০১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২০
206 Views
                                                মোঃ সিরাজ আল মাসুদ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মফস্বলে যারা সাংবাদিকতা করি তারা লজ্জায় অনেক কিছুই বলতে পারি না। কিছু বলতে গেলেই যাদের সামনে সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের জাহির করি তাদের সামনে মাথা নত হয়ে যায়। তবুও কেউ একদিন না একদিন হয়তো বলবেন এ কথাগুলো। তাই আমিই শুরু করছি। ‘ঢাল নাই, তলোয়ার নাই, নিধিরাম সর্দার ‘ – ঠিক এটাই মফস্বলের সাংবাদিকদের অবস্থা। প্রতিদিনের কাজ প্রসঙ্গে কিছু বলি – প্রতিদিনের কাজ সাংবাদিকগণ দুরকম ভাবে শুরু করেন। দু’ধরনের এজন্যই বললাম কারন সাংবাদিকদের মধ্যে দুটো শ্রেণী আছে। কেউ তৈল মারে আবার কারো কারো তৈল মর্দন একদম পছন্দের নয়। সুতরাং কাজটাও দু’ভাবে শুরু হয়। একদল সাধারণ মানুষের কষ্ট, দুর্দশা তুলে আনেন। কি করলে মফস্বলের মানুষগুলো ভালো থাকবেন, তাদের ভালো থাকার উপায় গুলো কি কি? এসব বিবেচনায় কাজে নেমে পরেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারনে সম্ভব হয়ে উঠে না। আবার নিজের পিঠ বাঁচাতেও অনেক সংবাদ আঁতুড়ঘরেই মারা যায়। অপর দল – টাকা পয়সার ধান্দায় ঘুরে বেড়ায়। সাধারণ মানুষকে বেকায়দায় ফেলে টাকা কামানোর ধান্দা করে। মানুষকে শুধরে নেবার বা ভুল কাটিয়ে উঠার সময় দিতে চায় না। তার সাথে আষ্টেপৃষ্টে লেগে থাকে। উদ্দেশ্য একটাই যত পাপাচার আছে করো তবে আমাকে নির্দির্ষ্ট কিছু অংশ দিও। নির্দিষ্ট কিছু অংশ হাতে পেলে সকল কাজ জায়েজ। না পেলেই নিউজ পাবলিশের হুমকিধামকি। সমাজে নিজের মান বাঁচাতে প্রায়শই এ সকল সাংবাদিকদের লালনপালন করে একদল লোভতুর মানুষ । এই দ্বিতীয় শ্রেণীর সাংবাদিকরাই বহুরুপী। তাদের নির্দিষ্ট কোন দল নেই, ধর্ম নেই। কবি নজরুল তার ‘সাহেব ও মোসাহেব’ কবিতায় লিখেছিলেন -‘সাহেব কহেন, চমৎকার! সে চমৎকার! মোসাহেব বলে, ‘চমৎকার! সে হতেই হবে যে! হুজুরের মতে অমত কার? তারা স্বচ্ছ জলের মত। তাদের যে রঙের বোতলে রাখবেন তারা সে রঙই ধারন করবে । এরা বি এনপির আমলেও দাপিয়ে বেড়াবে আবার আওয়ামী লীগের আমলেও দাপিয়ে বেড়াবে। কারন তাদের মাথায় ঘিলুর ওজন অনেক বেশি।
মফস্বলে সাংবাদিকতায় অনেক প্রতিবন্ধকতাও আছে। সঠিকভাবে কাজ করতে গেলে চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, সরকারি প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন সময় মফস্বল সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে। নানা হুমকিধামকি। একদল বলবে এই সংবাদ পরিবেশন করলেন কেন? আরেকদল বলবে এই সংবাদ পরিবেশন করলেন না কেন? সমাজের দুষ্ট মানুষের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মফস্বলে সাংবাদিকতা সহজ না। প্রশাসনকে ক্ষেপিয়েও মফস্বলে সাংবাদিকতা করা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পরে। কারন, পত্রিকার বিজ্ঞাপণ তাদের কাছে চেয়ে নিতে হয়। এছাড়াতো সাংবাদিকদের আর কোন আয় নেই ( এ কথাটি সবার জন্য প্রযোজ্য নহে)। তাহলে সঠিক সংবাদ পরিবেশন কিভাবে করবে মফস্বল সাংবাদিক? জনমনে প্রশ্ন এসেই যায়। হ্যাঁ এর মধ্যে নিজের গা বাঁচিয়ে যতটুকু কলমে নিয়ে আসা যায় এটা একজন ভালো সাংবাদিকের পরিকল্পনা করে। কারন এছাড়া মফস্বলে সাংবাদিকতা করার কোন পথ নেই। আগেই বলেছি মফস্বলের অনেক সংবাদই আঁতুড়ঘরে মারা যায়।
পাশাপাশি মফস্বলে একজন সাংবাদিক তার পেশাগত কারণে যখন কোন প্রতিকূলতার মাঝে পড়ে তখন তার নিয়োগকারী সংবাদমাধ্যম তাকে সহায়তার জন্য কতটা এগিয়ে আসে সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে।
মফস্বল সাংবাদিকের বেতন/ভাতা সুযোগ/ সুবিধা সূমহ- এমন অনেক জাতীয় দৈনিক আছে যার জেলা প্রতিনিধিদের পর্যন্ত বেতন পান না। উপজেলার কথা না হয় বাদই দিলাম। এই ক্ষেত্রে ছোটবেলায় পড়া একটা বাগধারার কথা মনে পরে গেল। ” মাছের মা”। আমাদের সমাজের কিছু দায়িত্বহীন বাবার মত। উপজেলা প্রতিনিধি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়োগ পান বিজ্ঞাপণ কমিশনের উপর ভিত্তি করে। এর শতকরা হার ৯৮%। সংখ্যাটি কিন্তু কম নয়। আপনি তেলবাজি করে প্রশাসন থেকে বিজ্ঞাপণ সংগ্রহ করবেন। তাহলে প্রশাসনের অপকর্মের সংবাদ পরিবেশন করবেন কিভাবে? এটা একটা বিষয়। আর একটা হচ্ছে যেভাবেই হোক বিজ্ঞাপণ এনেছেন, আপনার পত্রিকায় পাবলিশও হয়েছে আবার যথা সময়ে বিজ্ঞাপন বিল পত্রিকা অফিসে পাঠালেন তারপরও আপনার প্রাপ্ত কমিশন ঝুলে থাকবে, ফাইল বন্ধি থাকবে আপনি সে কমিশনের প্রাপ্ত টাকা কবে, কখন পাবেন তা কেউ জানে না। আবার অনেক জেলা প্রতিনিধি ও উপজেলা প্রতিনিধির নিয়োগ পত্রও নেই।
অনেক মফস্বল শহরে রাজনৈতিক মতাদর্শ, আত্মীয়করন, বিভিন্ন সংগঠনে ক্ষমতার লড়াই, একক নেতৃত্ব কে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের মাঝেও রয়েছে তীব্র বিভেদ। আর এসব কারণে অনেক সাংবাদিক সাংবাদিকতার বাইরেও অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে কাজের ঝুঁকি। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে এমন ইউনিয়ন গুলোও রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বিভক্ত করে রেখেছে। তাই সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসতে পারছে না।
এত সবের পরও খবর পাঠানোর চাপ,বিজ্ঞাপনের চাপ রয়েছে ঘাড়ের উপর। ফলে খবরের পেছনে যখন মফস্বল সাংবাদিক ছুটছে তখন জীবনের নিরাপত্তার দিকে তাকানোর সুযোগ কোথায়? আর এসব উদ্ভট পরিস্থিতি মোকাবেলার কোন প্রশিক্ষণও নেই। শুধু বিপদ আর বিপদ। গত এক দশকে আমাদের দেশে টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইনের সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু মফস্বল সাংবাদিক স্বার্থ উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। আর শীঘ্রই এ পরিস্থিতি থেকে আমরা পরিত্রাণ পাবো এমন আশা করা মহাপাপ।
পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে – কেন তবে এই সাংবাদিকতা?
এমন প্রশ্নের জবাবে জানাতে চাই – যারা মফস্বল সাংবাদিকতা করেন এটা তাদের পেশা নয়। মানে বেশিরভাগ সাংবাদিক পেশাদারী সাংবাদিক নন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তাদের অন্যান্য কর্মও আছে। যেমন কেউ ব্যবসা করেন আবার কেউবা বেসরকারী চাকুরী করেন। পাশাপাশি লেখালেখির অভ্যাসবশত সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পরেছেন। কিবা শিক্ষিত কিছু মানুষ অধিকার আদায়ের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতা