নাগরপুরে বিলুপ্তির পথে শিমুল গাছ!

প্রকাশিত: ৭:০২ অপরাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০২১
0Shares
নাগরপুর, টাঙ্গাইল থেকে মো. ফরহাদ হোসেন ডেভিড :
দক্ষিণা বাতাসে আম্র মুকুলের মৌ মৌ ঘ্রাণে মুগ্ধ চারিদিক। কোকিলের সুমিষ্ট কুহুতালে ফাগুনের উত্তাল বাসন্তী হাওয়া দোলা দিচ্ছে । গাছে গাছে জেগে উঠেছে নতুন সবুজ পাতা। মুকুল আর শিমুল ফুল দেখে বোঝা যায় শীত বিদায় নিয়ে এসেছে ফাগুন। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে আবহমান গ্রামবাংলার প্রকৃতিকে রাঙিয়ে ফুটেছে নয়নাভিরাম শিমুল ফুল।
কালের বিবর্তনে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে হারিয়ে যাচ্ছে শিমুল গাছ। আগুন ঝরা ফাগুনে চোখ ধাঁধানো গাঢ় লাল রঙের অপরূপ সাজে সজ্জিত শিমুল গাছ এখন বিলুপ্তপ্রায়। বিগত এক-দেড় যুগ আগেও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অধিকাংশ বাড়ির আনাচে কানাচে আর রাস্তার ঢালে প্রচুর শিমুল গাছ দেখা যেতো। প্রতিটি গাছে গাছে প্রস্ফুটিত শিমুল ফুলই স্মরণ করিয়ে দিতো বসন্ত।
শিমুল গাছের শাখাগুলো বসন্তের আগমনে লাল শাড়ির ঘোমটা পরা গ্রাম্য নববধূর সাজে সজ্জিত হতে দেখা যায়, যা দর্শনে হতাশ প্রেমিকের মনেও জাগিয়ে তোলে আশা। অন্যান্য গাছের তুলনায় শিমুল গাছ অনেক উঁচু হওয়ায় বহু দূর থেকে এ মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। জোয়ার এনে দেয় কবির কল্পনার জগতে। কেবল সৌন্দর্যই বিলায় না শিমুল গাছের রয়েছে নানা উপকারিতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব।
জানা যায়, প্রাকৃতিকভাবে তুলা আহরণের অন্যতম অবলম্বন শিমুল গাছ। এ গাছের সব অংশেরই রয়েছে ভেষজগুণ। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা এখনো নানা রোগের চিকিৎসায় এ গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে। শিমুল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ‘বোমবাক্স সাইবা লিন’।
এটি বোমবাকাসিয়াক পরিবারের উদ্ভিদ। বীজ ও কান্ডের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়। রোপণের ৫-৬ বছরের মধ্যে শিমুল গাছে ফুল ফোটে। গাছটি প্রায় ৮০/৯০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। সেই তুলনায় বেশ মোটাও হয়। নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় শিমুল গাছের ভূমিকা রয়েছে।
বসন্তের শুরুতেই গাছে ফুল ফোটে। আর এ ফুল থেকেই হয় ফল। চৈত্র মাসের শেষের দিকে ফল পুষ্ট হয়। বৈশাখ মাসের দিকে ফলগুলো পেকে শুকিয়ে গিয়ে বাতাসে আপনা আপনিই ফল ফেটে প্রাকৃতিকভাবে তুলা  গুলি  উড়ে উড়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে, আবার বিভিন্ন ভাবে ছড়িয়ে পড়া বীজ থেকেই শিমুল গাছের জন্ম হয় কেউ কেউ ইচ্ছে করেও চারা রোপন করে।
অন্যান্য গাছের মত এ গাছ কেউ শখ করে লাগায় না। নেয়া হয়না কোনো যত্ন। অযত্ন আর অনাদরে প্রাকৃতিকভাবেই গাছ বেড়ে ওঠে। এ গাছের প্রায় সব অংশই কাজে লাগে। এর ছাল, পাতা ও ফুল গবাদিপশুর খাদ্য হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। বালিশ, লেপ ও তোষক তৈরিতে শিমুল তুলার জুড়ি নেই। অথচ বর্তমানে মানুষ এ গাছকে তুচ্ছ মনে করে কারণে অকারণে কেটে ফেলছে। অতীতে ব্যাপকহারে নির্মাণ কাজ, টুথপিকসহ নানা ধরনের প্যাকিং বাক্স তৈরি ও ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হলেও সেই তুলনায় রোপণ করা হয়নি। ফলে আজ বিলুপ্তির পথে।
শিমুল গাছ উজাড় হওয়ার ফলে পরিবেশের উপরে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। এ গাছ অনেক উঁচু হওয়ায় কাক, কোকিল, চিল, বকসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি বাসা বেঁধে বসবাস করত। এ গাছ উজাড় হওয়ার ফলে এসব পাখিরা আবাসস্থল হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে । গাছ না থাকায় আবাসস্থলের অভাবে ধীরে ধীরে এসব পাখিরাও হারিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলা কাঠুরী গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি হাজী মো. জুড়ান আলী মোল্লা বলেন, ‘আগে গ্রামে এবং উপেন্দ্র সরোবর ( বড় দিঘীতে )এবং রাস্তার পাশে বেশ কিছু  শিমুল গাছ ছিল। এই শিমুলগাছ ঔষধি গাছ হিসেবেও পরিচিত। গ্রামাঞ্চলের মানুষ বিষফোঁড়া ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে এ গাছের মূল ব্যবহার করত।’
একই গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল হাকিম মিয়া বলেন, এক সময় একটি বড় ধরনের গাছ থেকে প্রায় ১০/১৫ হাজার টাকার তুলা বিক্রি করা যেত। আগের তুলনায় এখন শিমুল তুলার দাম অনেক বেড়ে গেছে কিন্তু এর পরও এই গাছ নিধন হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
উপজেলা আ’লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মো. কোহিনুর  হোসেন বলেন, শিমুল গাছ রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা না নিলে এক সময় উপকারী গাছের তালিকা থেকে এ গাছটি হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো জানতেও পারবে না বাংলার মাটিতে শিমুল গাছ  নামের কোন গাছ ছিল। তাই সকলে সচেতন হয়ে বিলুপ্তি প্রায় এই শিমুলগাছ রক্ষা করতে চেষ্টা করা উচিত।