সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নে ইজিপিপি প্রকল্পে শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু ব্যবহার!

প্রকাশিত: ৮:৫৭ অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২১
0Shares
সাভার  প্রতিনিধিঃ 
ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি ইজিপিপি-EGPP (Employment Generation Programme for the Poorest) ২য় পর্যায়ের প্রকল্পে সরকারি বিধি না মেনে ভেকু (খনন যন্ত্র) ব্যবহার ও নির্ধারিত শ্রমিকের চেয়ে কম শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিন প্রকল্প স্থানে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে কথা বলে বিষয়টি জানা যায়। এছাড়া প্রকল্পের রাস্তায় গিয়ে রাস্তার পাশ থেকে মাটি কেটে নেয়ার জায়গায় ভেকু দিয়ে কাটার চিহ্ন দেখেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যও মুঠোফোনে ভেকু ব্যবহারের কথা স্বীকার করেন।
২০২০-২০২১ অর্থবছরে বনগাঁও ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের গান্ধারিয়া ডিপ টিউবওয়েলের রাস্তা হতে ছান্দা বস্তির সীমানা পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়ন কাজে ১৬ লক্ষ ৭২ হাজার টাকার প্রকল্প বরাদ্দ আসে। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন ২০৯ জন হতদরিদ্র শ্রমিক ২০০ টাকা মজুরিতে মোট ৪০ দিনে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা।
এই বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য এই প্রতিবেদক সহ দৈনিক মুক্তখবর এর ষ্টাফ রিপোর্টার ফয়জুল ইসলাম,  সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রার প্রতিনিধি ইমদাদুল হক এবং The Daily Tribunal পত্রিকার ষ্টাফ রিপোর্টার মামুন মোল্লা সহ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদক দল প্রকল্পস্থানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে।
এসময় রাস্তার কাজ যে ছান্দা বস্তি এলাকায় চলছে, সেখানে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে কথা হয়। এই প্রতিবেদকের নিকট ভিডিও বক্তব্যে তারা জানান, রাস্তার কাজ করার সময় মাটি কাটা হয়েছে ‘ভেকু (খননযন্ত্র)’ দিয়ে। আর এসব মাটি রাস্তার উপরে ‘লেভেল’ করার কাজে শ্রমিক ব্যবহার করা হয়েছে, তবে প্রতিদিন ২০৯ জন শ্রমিক ব্যবহার করতে তারা দেখেন নাই।
গান্ধারিয়া ডিপ টিউবওয়েলের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিডিও বক্তব্যে এখানে বসবাসরত মিঠু জানান, বনগাঁও ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ছান্দা বস্তিকে ঘিরে কয়েকটি দিকে রাস্তায় মাটি ফেলে রাস্তার কাজ করা হচ্ছে। এই মাটি কাটার কাজ ভেকু দিয়ে করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, তিনি একদিন আনুমানিক ৬০ জন শ্রমিককে ভেকুর কাটা মাটি রাস্তায় এনে সমান করতে  দেখেছেন।
এখানে বসবাসরত বয়োঃবৃদ্ধ আব্দুল গফুর জানান, গান্ধারিয়া পশ্চিম পাড়ার ছান্দা এলাকায় রাস্তা বানাতে দুইদিন ভেকু দিয়ে মাটি কাটতে দেখেছেন। তবে মাটি কাটার কাজ শ্রমিকদের করতে তিনি দেখেন নাই, শ্রমিকেরা শুধু ভেকু দিয়ে কাটা মাটি রাস্তায় ফেলে সমান ( লেভেল) করেছে। এসময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাস্তার যে অংশ থেকে ভেকু দিয়ে গভীরভাবে মাটি কেটে নেয়া হয়েছে, সেগুলোর বিপরীত দিকে বস্তির বাড়িঘর রয়েছে। এই বর্ষায় সেগুলো পানিতে পূর্ণ হয়ে গেলে শিশুরা অসতর্কভাবে পড়ে মারা যাবার সম্ভাবনা থেকে গেলো। আর বর্ষায় ওই সব জায়গায় রাস্তার মাটি ভেঙ্গে রাস্তা নষ্ট হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
একই কথা বলেন ওখানে বসবাসরত বয়োঃবৃদ্ধা নুরজাহান বেগম, মোঃ নেয়ামতউল্লাহ এবং মোঃ ফরিদ হোসেন। ভিডিও বক্তব্যে এই প্রতিবেদককে তারা জানান, রাস্তার মাটি কাটার কাজ ভেকু দিয়ে করানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, একটি ভেকু একদিন কাজ করলে অনেক শ্রমিকের কয়েকদিনের মাটি কাটার চেয়েও বেশী মাটি কাটা সম্ভব। আর এই সুযোগটাই গ্রহন করে দূর্ণীতিগ্রস্ত জনপ্রতিনিধিগণ প্রকল্পে উল্লেখিত শ্রমিকের চেয়ে অনেক অনেক কম শ্রমিক দিয়ে ভেকুর সাহায্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে প্রকল্পে উল্লেখিত শ্রমিকের বরাদ্দকৃত অর্থ তুলে নেয়। বনগাঁও ইউনিয়নের এই প্রকল্পের কাজটি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম তার ভাতিজা রাসেলকে দিয়ে করিয়েছেন বলেও জানান ছান্দা বস্তি এলাকায়র স্থানীয়রা।
এব্যাপারে মুঠোফোনে প্রকল্পস্থানের ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ ছিদ্দিকের নিকট জানতে চাইলে প্রথমে তিনি বলেন চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম নিজেই এই রাস্তার কাজ করাচ্ছেন।  কাকে দিয়ে করাচ্ছেন এই প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ‘আমরাই দায়িত্বে আছি, লোক দিয়ে করাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, রাস্তা তার ওয়ার্ডে হলেও চেয়ারম্যান কাজটা করাচ্ছেন। এখনও রাস্তার কাজ সম্পূর্ণ হয়নি বলেও জানান তিনি। তবে প্রতিদিন কতজন শ্রমিক কাজ করেছে বা করছে, এই প্রতিবেদককে তার সঠিক সংখ্যা তিনি বলতে পারেন নাই। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শ্রমিক অনেক খাটছে, আমার খাতায় লেখা আছে, দেখে পরে আপনাকে জানাতে পারবো।’
এসময় ভেকু ব্যবহারের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি ভেকু দিয়ে মাটি কাটার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভেকু এবং ‘লেবার’ দুইটা দিয়েই কাজ করা হয়েছে। লেবার পাওয়া যায়না এবং শক্ত মাটি কাটতে ভেকুর ব্যবহার করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে ‘লেবার’ পাওয়া যায়না স্থানীয় ইউপি সদস্যের এই বক্তব্যের পরে ছান্দা বস্তি এলাকার মানুষের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ‘তাদের এই এলাকায় হতদরিদ্র মানুষের অভাব আছে কিনা যারা কাজ করতে পারে?’ নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভিডিও বক্তব্যে জানান, এটা বস্তি এলাকা, এখানে এবং আশেপাশের এলাকায় অনেক হতদরিদ্র শ্রমিক আছে। তাদের সংখ্যা ২০০ জনের মতো হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, এর চেয়েও বেশী শ্রমিক আছে যারা এই মাটি কাটার কাজ করতে পারবে।
এদিক থেকে ইউপি সদস্য মোঃ ছিদ্দিক এর ‘শ্রমিক স্বল্পতার কারণে ভেকু ব্যবহার করতে হয়েছে’ সেটাও সত্য নয় বলে স্থানীয়দের কথায় প্রমাণ হয়।
এব্যাপারে জানতে চেয়ে মুঠোফোনে বনগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামকে একাধিকবার কল করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
The Daily Tribunal পত্রিকার ষ্টাফ রিপোর্টার মোঃ মামুন মোল্লা মুঠোফোনে সাভার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ একরামুল হক এর নিকট  এব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এবিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
 সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলামকে এবিষয়টি জানালে তিনি বিষয়টির তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলে জানান।