পরিচর্যার অভাবে সৌন্দর্য হারাচ্ছে  নাগরপুরের উপেন্দ্র সরোবর

প্রকাশিত: ১০:০৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২১
229 Views

 নাগরপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধিঃ

 ” নগর থেকে অনেক দূর, প্রাণ পূর্ণিমার নাগরপুর, ধলেশ্বরীর পলিমাখা ধান সরিষায় ভরপুর “- এই ঐতিহ্যকে বুকে ধারন করে ধলেশ্বরী যমুনা বিধৌত পলল সমতল ভূমি ঐতিহ্য ও নির্দশন ঘেরা নাগরপুর উপজেলা।টাঙ্গাইল জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার এবং উপজেলা শহর থেকে ১.৫ কিলোমিটার দক্ষিণে কাঠুরী নামক স্থানে সুন্দর, মনোরম এবং ঐতিহ্য পরিমণ্ডিত   উপেন্দ্র সরোবর বা ১২ ঘাটলা দিঘীটি অবস্থিত।
জানাযায়, আজ থেকে ৮৬ বছর আগে রায় বাহাদুর সতীশ চৌধুরীর বাবা উপেন্দ্র মোহন চৌধুরীর নামানুসারে ১১.২৬ একর জায়গার উপর এই দিঘীটি খনন করেন। তৎকালিন রায় বাহাদুর সতীশ চৌধুরী উপেন্দ্র সরোবরটির চার পাশ সুপ্রস্থ ১২ টি পাঁকা ঘাট স্থাপন করেন । দিঘীটিতে স্বচ্ছ পানি নিশ্চিত করার জন্য ৬ টি গভীর কুপ খনন করেন।
সেই সময়ে বিহার থেকে খনন বিশেষজ্ঞ এনে ৬০০ শ্রমিক দিয়ে ৩ বছর সময় ধরে খনন করে অর্থাৎ ১৩৩৮ সন থেকে ১৩৪১ সন পর্যন্ত এই দিঘী খনন কাজ চলে।
 এই দিঘি খননের পূর্বে জায়গাটি নেবড়া ডাঙ্গা বিল নামে পরিচিত। ৩ দশক পুর্বেও দিঘীর চালায় খেজুর গাছে ভরপুর ছিল। বর্তমানে আগাছায় ভরপুর এ দিঘীটিতে খেজুর গাছের দেখা পাওয়া দুস্কর। এখনও
 হরেক রকমের পাখির কুজনে মুখরিত থাকে এই সরোবরটি। দিঘীর স্বচ্ছ জল রুক্ষ-কঠিন মনকেও বিমোহিত করবে। প্রাকৃতিক  সু- শীতল বাতাস  মনকে উদাসী করে তোলে।
কথিত আছে, কোন এক জোসনা রাতে জমিদার রায় বাহাদুর চৌধুরী তার সঙ্গীদের নিয়ে বৈঠকখানায় বসে ছিলেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন রাতের বেলায় কলসি কাঁখে দুরের বিল থেকে তার প্রজারা পানি আনছে। পরে তিনি খবর নিয়ে জানতে পারেন,  প্রজারা সুপেয় পানির অভাবে রাতে বিল থেকে পানি সংগ্রহ করে। এ ঘটনায় রায় বাহাদুর অত্যান্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হয়ে নেবড়া ডাঙ্গা বিলের উপর বড় করে একটি দিঘী বা সরোবর খননের পরিকল্পনা  গ্রহন করেন।
জমিদার রায় বাহাদুর তার অধিকাংশ কাজ কর্ম দেখভাল করতেন বাবু ভবানী সেন নামে এক ব্যক্তি।যাকে সবাই সেন কোম্পানী নামে চিনতেন। দিঘির বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে আশেপাশের গ্রাম কাঠুরী, বারাপুষা, দুয়াজানী, চারাবাগ, আন্দিবাড়ি, মেঘনা গ্রামের শ্রমিক দিয়ে কাজ করাতেন। আর এই শ্রমিকদের সরদার ছিলেন বারাপুষা গ্রামের কামাল সরদার।
লোকমুখে জানা যায়, দিঘীর সৌর্ন্দয্য বৃদ্ধির জন্য কলিকাতা থেকে ঘাস এনে লাগানো হয়েছিল। কাঠুরী গ্রামের নায়েব আলী দিঘী নিয়ে  একটি গান রচনা করেছিলেন । এই গানটিতে দরদ দিয়ে সুর দিতেন কাঠুরী গ্রামের হাতেম আলী, রমজান আলী ও হাসু বয়াতি। গানের কথাগুলিই জমিদার পরিবারের পরিচয় বহন করে।
 উপেন্দ্র সরোবরের চার দিকে ঘুরলে প্রকৃতির অপরুপ শোভায় মন ভরে যায়। সরোবরের পশ্চিম পাশে প্রধান বা মেইন গেটের পাশে মাথার উপর কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িঁয়ে আছে বট ও পাকড় গাছ। যার বয়স ৮৬ বৎসর। এই গাছের বির্স্তীন ছায়া ভ্রমন পিপাসু ও স্থানীয়দের হৃৃদয় জুড়িয়ে দেয়। দিঘীর উত্তর পারে দাড়িঁয়ে আছে সারি সারি গাছ। এই গাছের নিচে দাড়ালে এক অন্য রকম অনুভূতি সৃষ্টি হয়। আর দিঘীর এই মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে বাঙ্গালীর প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানে অর্থাৎ ঈদ, পুঁজা , ১লা বৈশাখী, ১৩ ভাদ্র সহ প্রায় প্রতিদিনই  দর্শনার্থীরা ভিড় লেগে থাকতো।
এক সময় এই উপেন্দ্র সরোবরটি এক নজর দেখার জন্য  দেশ-বিদেশ থেকে ভ্রমণ পিপাসুরা বেড়াতে আসতেন। প্রতিদিন বিকেলে সরোবরে জমে উঠত  তরুণ-তরুণীদের আড্ডা।
ঐতিহাসিক টাঙ্গাইল জেলা অনেক ঐতিহ্য বহন করছে। তার মধ্যে নাগরপুর জমিদার বাড়ী ও ১২ ঘাটলা দিঘী অন্যতম। একটু স্বস্তির  নিশ্বাস ছাড়ার মত, প্রকৃতির খুব কাছে যাওয়ার মত বা সান্নিধ্য পাওয়ার মত এরকম মনোরম পরিবেশ আর কোথাও নেই । শহরের চার দেওয়ালের গন্ডি পেরিয়ে  আর যান্ত্রিক একঘেয়ামি ব্যস্ততামুখর জীবন থেকে প্রশান্তির জন্য ঘুরে আসার আদর্শ স্থান এই উপেন্দ্র সরোবর।
 সাধারনের কথা চিন্তা করে  ঐতিহ্যবাহী উপেন্দ্র সরোবর বা ১২ ঘাটলা দিঘীটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।  দিঘির বর্তমান অবস্থা খুবই নাজুক।  অধিকাংশ ঘাটলা  ব্যবহার অনপোযোগী। কচুরি পানায় ছেয়ে গেছে স্বচ্ছ জল, সুপেয় জল থেকে দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আগাছায় ভরে গেছে চারপাশ। অযত্নে, অবহেলায় পরে আছে ঐতিহ্যবাহী কালেরস্বাক্ষী এ দিঘীটি।
স্থানীয় শতবর্ষী প্রবীণ কাঠুরী গ্রামের মোঃ চাঁন মিয়া ও জুড়ান আলী মোল্লা জানালেন, ঐতিহ্যবাহী এ দিঘী ঘিরে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যখন সুপেয় পানির অভাব ছিলো তখন জমিদার বাবুরা সাধারণ মানুষের জন্য এ দিঘীটি খনন করেন। আমাদের শৈশব কেটেছে এই দিঘীর স্বচ্ছ জলে স্নান করে, গাছের ছায়ায় সুশীলত বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে। অনেক আদরের, অনেক স্মৃতিবিজড়িত এই দিঘীটি। এটি আমাদের প্রাণ। তাই দিঘীটির ঐতিহ্য আবার পুনরায়  ফিরিয়ে আনতে সরকারের কাছে মিনতি জানাই।
উপজেলা  প্রশাসন হতে জানা যায়, দিঘীটি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের আওতাভুক্ত হয়েছে।
নাগরপুরবাসীর প্রাণের দাবি,  সরোবরের রক্ষনাবেক্ষন ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করে এর
সৌর্ন্দয্য ও জৌলুস ফিরিয়ে এনে দ্রুত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে দিঘীটি পরিচিতি লাভ করুক।  আর বেঁচে থাকুক জনবান্ধব জমিদারের স্মৃতিচিহ্ন টুকু।