বাংলাদেশে ক্রমেই ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাস করোনা!

প্রকাশিত: ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মে ১৪, ২০২০
0Shares

নিউজ ডেস্ক: দেশে ক্রমেই ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাস করোনা; দিন দিন বাড়ছে এ মহামারীতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, বাড়ছে মৃত্যু। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত আরও ১১৬২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে; এর থাবায় মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। দেশে এক দিনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনায় এটি সর্বোচ্চ রেকর্ড। সব মিলিয়ে বর্তমানে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দৈনিক আমাদের সময়

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনসিটিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। আর এ পর্যন্ত শনাক্ত করা হয়েছে ১৭ হাজার ৮২২ জনকে, মৃত্যু হয়েছে ২৬৯ জনের। এর মধ্যে মে মাসের প্রথম ১৩ দিনে শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ১৫৫ জন। অর্থাৎ গত ১৩ দিনেই শনাক্ত হয়েছে মোট রোগীর ৫৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। দেশে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫৩৮ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশের শরীরে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস পাওয়া গেছে।

এদিকে জানা গেছে, সন্দেহভাজনদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার রিপোর্ট প্রাপ্তি এবং পরীক্ষায় শনাক্তকৃত রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে বিলম্বসহ অন্যান্য সেবা পেতে খুবই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তদুপরি একের পর এক সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হওয়ার জেরে হাসপাতালগুলোতে ওয়ার্ডবয়, এমএলএসএস, ক্লিনার ও আয়াসংকট সৃষ্টি হয়েছে; সংকট রয়েছে টেকনোলজিস্টেরও। সঙ্গত কারণেই করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা নিয়ে অন্তহীন অভিযোগ জমছে রোগী ও স্বজনদের।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের জাতীয় পরামর্শক টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, করোনার ম্যাপিং বা চরিত্র এতদিন ধরে গ্লোবালি দেখে আসছি, এ ভাইরাস খুব দ্রুত মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়।

আমাদের দেশেও এখন তেমনটি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে এর আগে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলাম। গতকালও ফের সব হাসপাতাল পরির্দশন শেষ করেছি। হাসপাতালগুলোর অবস্থান নিয়ে একটি রিপোর্ট সরকারের কাছে তুলে ধরব।

ডা. আর্সলান আরও বলেন, কোভিড চিকিৎসার হাসপাতালগুলোতে সব কাজ চিকিৎসক-নার্স করতে পারবেন না। রোগীদের কিছু কিছু কাজ আছে, যেগুলো করার জন্য ওয়ার্ডবয়, এমএলএসএস, ক্লিনার ও আয়া প্রয়োজন; কিন্তু এ জাতীয় কর্মচারীর মারাত্মক ঘাটতি আছে। এর মধ্যেই চিকিৎসা চলছে; কিন্তু ফলপ্রসু হচ্ছে না। বাইরে আলোচনা হয়Ñ রোগী খাবার পায়নি, অক্সিজেন পায়নি বা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এতগুলো আইসিইউ বেডের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার মেনটেন করা যায় না। এ ক্ষেত্রে রিজার্ভার প্রয়োজন ছিল। প্রথম থেকে এগুলোর উদ্যোগ নেওয়া হলে বা আমরা যখন সুপারিশ করেছি তখন থেকে উদ্যোগ নিলেও এখন মনে হয় কিছু উন্নতি হতো। যাই হোক, এখন এসব সমস্যা দ্রুত দূর করা দরকার।

এদিকে দেশে করোনার সংক্রমণ প্রথমদিকে সীমিত থাকলেও এখন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে; প্রতিদিন হাজারো রোগী শনাক্ত হচ্ছে। আইইডিসিআরের তথ্য বলছে, করোনায় সর্বাধিক সংক্রমিত হচ্ছে যুবকরা। আক্রান্তদের মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী ৩ শতাংশ, ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ৮ শতাংশ, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২৬ শতাংশ, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ২৪ শতাংশ, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১৮ শতাংশ, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ১৩ শতাংশ, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৮ শতাংশ।

আইইডিসিআরের করোনায় মৃত্যুর বিশ্লেষণভিত্তিক তথ্য বলছে, দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বেশি মারা যাচ্ছেন বয়স্করা। এ পর্যন্ত দেশে ২৬৯ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৪২ শতাংশ, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ২৭ শতাংশ, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১৯ শতাংশ, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৭ শতাংশ, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৩ শতাংশ এবং ১০ বছরের নিচের বয়সী ২ শতাংশ।

সুস্থতার তথ্য বিশ্লেষণের তথ্য বলছে, দেশে ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ২১৪ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৩৬১ জন। এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল থেকে ৩৩৪ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ৪৭৩, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ১৯, ঢাকা মহানগর হাসপাতালের ১০১, রিজেন্ট হাসপাতালের ২৪, সাজেদা হাসপাতালের ৫৫, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালের ১৭৭, মিরপুর লালকুঠি হাসপাতালের ২৪, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২০০, ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটে স্থাপিত করোনা ইউনিটের ১২৫ এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের ১৫০ জন রয়েছেন।

এছাড়া বিভাগীয় পর্যায়ে ঢাকা বিভাগে ৯২০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১৯, রাজশাহী বিভাগে ৩৭, খুলনা বিভাগে ৫৮, বরিশাল বিভাগে ৮৬, সিলেট বিভাগে ৪৭, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৭১ এবং রংপুর বিভাগে ৮১ জন।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিনজন রোগী শনাক্ত হয়। এসব রোগী ছিল ঢাকা ও মাদারীপুর জেলার। প্রথমদিকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুর কাস্টার এরিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংক্রমণ রোধে কাস্টার এরিয়া লকডাউন করে স্থানীয় প্রশাসন। এতে করে কাস্টার এরিয়া মাদারীপুরে সংক্রমণের বিস্তার না হলেও ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় সংক্রমণ বাড়তে থাকে। এরপর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ বিভিন্ন স্থানে গমন করায় সেখানে সংক্রমণ ছড়াতে থাকে। তবে মার্চ মাসে আক্রান্তের হার কম হলেও দিন দিন তা বাড়তে থাকে।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, ৮ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শনাক্ত হয় ৫১ জন এবং মারা যায় ৫ জন। এপ্রিলে শনাক্ত হয় ৭ হাজার ৬১৬ জন এবং মারা যায় ১৬৩ জন। আর মে মাসের ১৩ দিনে ১০ হাজার ১৫৫ জন শনাক্ত হয়েছে এবং মারাে গছে ১০১ জন। শনাক্তদের মধ্যে ঢাকা মহানগর ও ঢাকা বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা মহানগরে ৫৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ঢাকা বিভাগে ২১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ, ময়মনসিংহ বিভাগে বিভাগে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ, সিলেট বিভাগে ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ২ দশমিক ৬২ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ১ দশমিক ৯০ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে ১ দশমিক ১৮ শতাংশ ও রাজশাহী বিভাগে বিভাগে ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

গত ২৪ ঘণ্টায় ২১৪ জন সুস্থতা লাভ করেছেন। এটিসহ এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৩৬১ জন। গতকাল বুধবার দুপুরে দেশের কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টায় ৭ হাজার ৯০০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬২ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। দেশে এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৭ হাজার ৮২২ জন। বর্তমানে দেশের ৪১ ল্যাবে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব ল্যাবে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৪ হাজার ২৩০টি পরীক্ষা করা হয়েছে।

ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে রাখা হয়েছে ১৫০ জনকে। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন দুই হাজার ৩৫ জন। ২৪ ঘণ্টায় কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৫৫৮ জনকে। এ পর্যন্ত দুই লাখ ২৭ হাজার ৬৪২ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। কোয়ারেন্টিন থেকে ছাড় পেয়েছেন এক লাখ ৮২ হাজার ৩৬১ জন। বর্তমানে কোয়ারেন্টিনে আছেন ৪৫ হাজার ২৮১ জন।