প্রথমে পাগলী প্রেমিকা হয় পরক্ষণে বাদী : সরোজ মেহেদী

প্রকাশিত: ৫:১০ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০২০
0Shares

সরোজ মেহেদী – লেখক, শিক্ষক ও গবেষক

১. এই দেশের একদল মেয়ে প্রথমে পাগলী প্রেমিকা হয়। তারপর স্বর্গ জয়ে যায়, দিল্লিকা লাড্ডু খায়, তারপর যা হওয়ার হয়। অত:পর তারা বিশেষ বাদী হয়ে উঠে। আরেকটা প্রেম বা বিয়ে হওয়া পর্যন্ত কমবেশি গালাগাল চলে। এই গালাগালটা অবশ্য যৌক্তিক, তর্ক ও মাত্রা সাপেক্ষে। একদল ছেলের বেলাও এটা সত্য। তারা খেতে গিয়ে না পেরে বিশেষ বাদী হয়ে উঠে।
২. একটা দলের কাছে নারীবাদটা প্রফেশন। ওরা এই ধান্দাটা করে খায়। পলিটিক্যাল সমর্থন নিতে মিছিল মিটিং করে। পেট চালাতে পল্টিবাজি চলে। ওরা এই পৃথিবীতে যাই ঘটুক, এটাকে টেনে এনে নারীবাদ দিয়ে কচলানোর চেষ্টা করবে। ওরা কিন্তু আবার সবকিছু দেখে রাজনীতির চোখে। অপরাধী কতবড় অপরাধী তা নির্ধারণ করে তার বিশেষ পরিচয় দেখে, যেমন ধর্ম, রাজনীতি, আদর্শ।
৩. আরেকদল মেয়ে আছে মেন্টালি ডেভাসটেটেড/ডিস্টার্বড। বাবা-চাচা বা কাছের কারো কাছ থেকে যৌন সহিংসতার শিকার। ওদের ক্ষোভ থাকে। এদের ছোট্ট একটা অংশ সেই ক্ষোভ ২ নাম্বার দলের সাথে মিশে ঝাড়ে। অথচ ১ম ও ৩য় গ্রুপের যারা তারা অসৎ না, তাদের কাজ-কারবার উদ্দেশ্যমূলকও না। তাদের প্রায় সবাই শেষ পর্যন্ত জীবনকে ভালোবাসে, মানুষ নিয়ে মমতায় বাঁচে। ২য় নাম্বার কপটতাশ্রয়ী।

২য় দল যা করে বেড়ায় তার অনেক কিছু নারীবাদী মূলনীতির সাথেও যায় না। নারীবাদ বা ফেমিনিজম ২ রকমের হয়। লিবারেল, রেডিক্যাল। লিবারেলিজমটা আমার কাছে কাইন্ড অব শো অফ মনে হয়। আমাদের বঙ্গবাসী নারীরা এখনো রেডিক্যাল নারীবাদ নিয়ে ধারণা রাখে না। এখানে ইন্টারসেকশনালিটির মতো আরও অনেক ইস্যু আছে। দুনিয়াজুড়ে এখন সবচেয়ে যে সমালোচনাটা নারীবাদীদের নিয়ে হচ্ছে সেটা হলো, বৈষম্য দূর করার নামে যে আন্দোলন এটা নিজেই আসলে বৈষম্যমূলক, বা পরিপূর্ণ না। নারীবাদী সংগঠনগুলো আপাত দৃষ্টিতে ব্যবসায়িক সমিতিতে পরিণত হয়েছে। ওদের উদ্দেশ্য যতটা না নারীর প্রতি সহিংসতা বা বৈষম্য দূর করা তার চেয়ে অনেক বেশি প্রফিট করা। মেইক মানি গেইম।

২য় দলের কাজটা উদ্দেশ্যমূলক বা পেটমূলক হওয়ায়। ওদেরকে কিছু বলে লাভ নেই। তবে ওদের অনেক কাজ-কামই আমাদের সমাজের জন্য ক্ষতিকর। আর এর যে কুপ্রভাব, তা কিন্তু প্রধানত নারীকেই ভোগ করতে হয়। ১ম দল নারীবাদী,-টারিবাদী কিচ্ছু না। তাদের ব্যাপারটা ক্ষোভের। এটা সময়ের ব্যবধানে ঠিক হয়ে যায়। আর পুরুষদের দায়িত্ব হচ্ছে ৩য় যে গ্রুপ আছে তাদের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া। এমন ঘটনা যেনো আর না ঘটে সে লক্ষ্যে কাজ করা। স্রেফ নারীবাদী কাজ-কাম বলে নারীর প্রতি যে সহিংসতা তা থেকে পুরুষ দায়ভার এড়াতে পারে না। পুরুষের ঘরটাই কোন না কোন না নারী সাজায় এটা ভুলে গেলে সমস্যা।

এর বাইরে একদল মেয়ে আছে যাদের আমরা নারীবাদী বানিয়ে ফেলি। তাদেরকে যেই অর্থে নারীবাদী বানাই ফেলি সেই অর্থে আমিও নারীবাদী। নারীর প্রতি যে সহিংসতা, তা নিয়ে এই সমাজে যেসব পুরুষ লজ্জ্বিত আমিও তাদের একজন। এর প্রতিবাদে আমিও সরব হই। অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটা নারী-পুরুষ ভেদে সবারই দায়িত্ব। দু:খজনক হলো, নারী হয়ে নারীর পক্ষে কথা বলার কারণে এই গ্রুপটাও সামাজিক হেনস্থার শিকার হচ্ছে! কথা হচ্ছে, অপরাধ দেখেও নিরব থাকার যে বাদ সেটাকে আমি ঘৃণা না করে পারি না। সামান্য বিবেকবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে আমাকে একজন মানুষের বিরুদ্ধে যে অন্যায় তার প্রতিবাদ করতেই হবে। তবে এখানে লিঙ্গভেদে অপরাধকে ভাগ করার বিরোধী আমি। অপরাধতো অপরাধই তার আবার নারী পুরুষ কিসের!

সহিংসতার শিকার না, আমরা যারা এমন নারী-পুরুষ আছি, আমাদের সবারই দায়িত্ব হচ্ছে সব ধরনের সহিংসতার, অপরাধের প্রতিবাদ করা, প্রতিরোধে কাজ করা। আর এ কাজটা নারী ও পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই করতে হবে। এখানে ভাগ করে ফেলা মানে হবে সমাজকে ধ্বংশের পথে নিয়ে যাওয়া।

নারীবাদী বা রাজনীতিক নারীরা না মেয়ে থাকেন না পুরুষ হয়ে উঠেন বা তারা দেখতে কালো বলে এসব করে বেড়ান, এমন অভিযোগ আমার কাছে ভিত্তিহীন বলে মনে হয়। আর এর বাইরেও বহু মেয়ে দেখা যায় যাদের দেখলে মেয়েসুলভ মায়া বা আকর্ষণ জাগে না। তাহলে কি করে শুধু ওই গ্রুপটাকে দোষারোপ করতে পারি আমরা? পুরুষের চোখে নারীর যে অবনমন ধরা পড়ছে, নারীকে নারী মনে হয় না, এই নারীর সাথে ঘর করা যায় না ব্লা ব্লা।
নিশ্চয়ই নারীর চোখেও ছেলেদের এমন অবনমন ধরা পড়ে। সেও হয়তো ভরশা করার মতো ছেলে খুঁজে পায় না। তার চারপাশে যাদের দেখে তাদের ঠিক পুরুষ পুরুষ লাগে না! এদের অনেককেই হয়তো মেয়েদের মতো ন্যাকা ন্যাকা লাগে! আমার মনে হয় এটাকে সামাজিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করলে সমাধানের একটা উপায় বের করা সম্ভব। শুধু শুধু নারীকে স্কিপ গট বানালে সমস্যাটা চোখ বুজে না দেখার ভান করা হবে। আসলে নারী পুরুষ না সবদিক দিয়েই আমাদের সামাজিক অবনমন হচ্ছে।

আমাদের সমাজের এখনো সবেচয়ে আশার দিক হলো, এখানে এখনো জীবন সজীব। মা শব্দটা এখনো বিশেষ অর্থ বহন করে, বাবা বললে চোখ আদ্র হয়। এখনো ভাই-বোন সম্পর্কটা পবিত্র বলে গণ্য হয়। যে সামাজিক কাঠামো পশ্চিমা সমাজে বহু আগেই বিলীন হয়ে গেছে। সবকিছুতে পশ্চিমাদের অনুকরণের যে চেষ্টা সেখান থেকে বের হয়ে আসাটাও সবার আগে জরুরি (নারীবাদটা পশ্চিমা অনুকরণই)। বাঙালি যেদিন বুঝতে শুরু করবে, পশ্চিমা সমাজ আর আমাদের সমাজ এক না ততদিনে এই দেশের অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

নারীরা ভালো থাকুক। নারীরা ভালো থাকলে মায়েরা ভালো থাকে। মায়েদের ভালো থাকতে দেখা বাবাদের খারাপ থাকার সুযোগ থাকে না। এভাবে ভাই-বোন, বাবা-মা মিলে দীর্ঘজীবী হোক আমাদের সুখের চাষবাষ। আামদের সমাজ হোক বৈষম্যমুক্ত এক সোনালী সমাজ, রক্ষা হোক সব মানুষের মানবিক মর্যাদা।

(এই ধারণাটা আমাদরে সমাজে এখনো গ্রহণযোগ্য নয়: নারীর প্রতি যে সহিংসতা তা শুধু পুরুষের তরফে হয় না। নারীর তরফেও হয়, বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার বেলায়। সুতরাং এসব দূর করতে হলে আমাদের অপরাধ ও অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিৎ করার কথা বলতে হবে। কোনো লিঙ্গ, ধর্ম বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কথা বলে আদৌ কোনো ফল হবে বলে মনে হয় না।)

সংগৃহীত- ফেসবুক (সরোজ মেহেদী)