আম্ফানে তেঁতুলিয়ায় নিরুদ্দেশে ২ হাজারোর্ধ ডিম দেয়া হাঁস

প্রকাশিত: ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, মে ২৯, ২০২০
0Shares

এম.নাজিম উদ্দিন,পটুয়াখালী:
ফারুক হোসেন। সুপার সাইক্লোন আম্ফানে ভাগ্য বিড়ম্বিত এক যুবক। পেশা বদলে স্বপ্ন দেখছিলেন হাঁসের খামার করে স্বাবলম্বী হওয়ার। কিন্তু আম্ফানে তেঁতুলিয়ার পানির স্রোতে  ভেসে যায় তার সে স্বপ্ন পানির প্রবল তোরে দুই হাজারোর্ধ ডিম দেয়া হাঁস নিরুদ্দেশে ভাসিয়ে নিয়ে পটুয়াখালীর বাউফলের মমিনপুর চরের মনোয়ারা এগ্রো নামে ফারুক হোসেনের হাঁসের খামার হয় লন্ডভন্ড।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, বৈশ্বয়িক আবহাওয়া পরিবর্তণের প্রভাবে তেঁতুলিয়া নদী ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সাত সাতবার উপজেলার ধুলিয়া এলাকার ভিটেমাটি খুঁইয়ে কোনমতে সামন্য একটু জমি কিনে বসতি গড়ের পাশের ইউনিয়নের মমিনপুর গ্রামের নানা বাড়ি এলাকায় ফারুকের বাবা গনি মৃধা। আর সর্বহারা সংসারের ঘানি টানতে বাধ্য হয়ে মাধ্যমিকের গন্ডি পাড় হতে না হতেই বাপ-দাদার পেশা বদলে ঢাকার একটি কোম্পানির গাড়ির ড্রাইভিংয়ের কাজে জড়িয়ে পড়েন ফারুক।

এরপর ঢাকার ওই ড্রাইভিংয়ের কাজের সামান্য আয়ে বাবা-মা, ভাইবোন নিয়ে সংসার চালাতেও ধকল কম যায়নি তার কোন অংশে। কিন্তু প্রগার টান থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে দেশে ফিরে পূন:রায় বাপ-দাদার পেশা চাষবাস কিংবা হাঁস-মুরগী পালনের মতো কাজে জড়িয়ে স্বাবলম্বী হবেন প্রতিনিয়তই এই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল ফারুকের মাথায়।

আর এ কারণেই মনোয়ারা এ্যাগ্রো নামে মমিনপুর চরে এক দৃষ্টি নন্দন হাঁসের খামার করে স্ত্রী মুন্নি আক্তারকে দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে ছেলে-মেয়েসহ পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়ি। নিয়মিত আসা-যাওয়ার মাধ্যমে কর্মচারিদের সঙ্গে খোঁজ খবরও রাখছিলেন তিনি; সুযোগমতো খামারটাকে বড় করে।

একপর্যায়ে নিজেও স্থায়িভাবে গ্রামে ফিরে পরিবার পরিজন নিয়ে স্বাবলম্বী জীবন যাপন করবেন কেবল এই আশায়। কিন্তু আম্ফানের প্রভাবে ২০ মে, বুধবার রাতে তেঁতুলিয়ার পানির প্রবল তোরে লন্ডভন্ড হয় তার হাঁসের খামার। নিরুদ্দেশে ভেসে যায় খামারের সেট, বেড়া, বিভিন্ন সরঞ্জামাদিসহ দুই হাজারোর্ধ ডিম দেয়া হাঁস।

সংসার-জীবনে ধকল খাওয়া ফারুক জানান, আগের বছর অক্টোবরের দিকে ২ লক্ষাধিক টাকায় ৫ হাজার হাঁসের বাচ্চা কিনে খামারের যাত্রা শুরু হয়। খামারের সেট, জাল ও অন্যান্য বাবদ খরচ হয় প্রায় তিন লক্ষ টাকা। চার জন শ্রমিক প্রতিনিয়ন কাজ করেন সেখানে। খাবার খরচসহ প্রত্যেককে মাসিক ১০ হাজার টাকার মতো বেতন দিতে হয় তাদের।

ধানের দাম বৃদ্ধির কারণে খামারের হাঁসের খাবারের খরচও বাড়ে বরাবরের তুলনায়। এছাড়া ভ্যাক্সিন ও ওষুধপত্রেও হয়েছে মোটা অংকের খরচ। কয়েকদিন আগে ইনফ্লুয়েঞ্জায় দেখা দিলে বিভাগীয় শহর বরিশালের ভ্যাটেনারি ল্যাবে পাঠায়ে রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারের ব্যাবস্থা নিতে নিতে ২ হাজারের মতো হাঁস মারা যায় খামারের।

এরপর করোনা কালে হাঁসগুলো ডিম দেয়া শুরু করলেও ডিমের দাম ভাল পাওয়া যায়নি। পরিবহন ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় প্রতি হাজার ডিম মাত্র ৫ হাজার টাকা হিসেবে বিক্রি করতে হয়েছে। এবার আম্ফানে রাতে তেঁতুলিয়ার পানির তোরে ২ হাজারোর্ধ ডিম দেয়া হাঁস নিরুদ্দেশ হয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন তিনি। খামারের বেড়া, সেট, জালসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদিসহ আসববপত্র ভেসে যায় পানিতে।

বিষয়টি তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন সমন্বয়কারী হাবিব গাজী নামে একজনের মাধ্যমে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরে জানালেও এখন পর্যন্ত কারো কোন সারা নেই। খামারের এমন বিপর্যয় কেউ সরেজমিন দু’চোখে একবার দেখতেও আসেননি বলে চোখের পানি ফেলেন তিনি। সরকারি বেসরকারি সহোযোগিতা না পেলে জীবনে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না বলেও জানান তিনি।

খামারের পঁচিশ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে ফারুক হোসেন বলেন, ‘ভেবে ছিলাম সংসার জীবনে ঘুরে যাবে ভাগ্যের চাকা। নদী ভাঙনে সর্বহারা কৃষকের ছেলে চাষবাসের নেশা আর মাটির মমতায় হাঁস পালনের মতো খামারের কাজে স্বপ্ন বুনছিলাম। ট্রেড লাইসেন্স করেছি। কৃষি ব্যাংক ব্যাবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছি। স্থানীয়রা খামার দেখে উৎসাহিত হবে। মাটির টানে আমিও ফিরতে পারব গ্রামে। কিন্তু আম্ফান সব স্বপ্ন লন্ডভন্ড করেছে আমার। ’

ফারুক হোসেনের খামার লন্ডভন্ড হওয়া নিয়ে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাফিজুর রহমান মোবাইলফোনে বলেন, ‘একই এলাকার সোহাগ সিকদার ও মিজানুর রহমান সিকদারসহ মমিনপুরের ফারুক হোসেনের খামারের ক্ষতিপূরন চেয়ে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তার মাধ্যমে তালিকা প্রনয়ণ করা হয়েছে এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। ফারুক হোসেনের হাঁসের খামারে স্থানীয়দের আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল। বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহোযোগিতার চেস্টা করা হবে।