করোনা মোকাবলোয় মানবকি বাংলাদশে চাই

প্রকাশিত: ১২:২৮ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২০
0Shares

লেখকঃ এস. এম. খালিদ হোসেন

বর্তমান বিশ্বে নোবেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)এক নিশ্চিত মারণঅস্ত্র হিসাবে আভির্ভূত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সকল উন্নত রাষ্ট্র এই রোগ কাটিয়ে উঠতে প্রায় ব্যর্থ। সময় আর পরিস্থিতি সবই আমাদের নিয়ন্ত্রণ ও সক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে দিন দিন। বিশ্বসভ্যতা অসহায় হয়ে পড়েছে প্রকৃতির দারুন দাপটের কাছে। প্রতিজ্ঞা এখন ঘরে থাকার! স্মরণাতীতকালের জয়জয়কার উন্নয়নের একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ এখন বিপর্যস্ত মহামারি করোনা ভাইরাসের ভয়াল গ্রাসে।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে এর উৎপত্তি। প্রাদুর্ভাবের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ২১৬ টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে এই মরণগাতি ভাইরাসটি।বিশ্বব্যাপি সংক্রমণের জোয়ার বাংলাদেশের উপর দিয়ে সয়লাভ করায় এই দুর্যোগ এখন এক ভয়াবহ অবস্থার রুপ ধারন করেছে। তবে এটি একটি বাস্তব উপলব্ধি যে, দুর্যোগ মানুষকে বদলে দেয়। বিপদের সময়ই মানবতার সত্যিকারের বিকাশ ঘটে।

বারবার এটার প্রমান পেয়েছি আমরা।সবচেয়ে বড় প্রমান আমরা পেয়েছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কারন জনগণের বিশাল এবং সর্বাত্মক জাগরণ ছাড়া একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের জয় এত সহজে আসতো না। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, বিভিন্ন জাতীয় দুর্যোগেও বারবার আমরা প্রমাণ করেছি, সম্পদে ঘাটতি থাকতে পারে আমাদের; কিন্ত মানবতায় আমরা অনন্য।

করোনা ভাইরাসের এই মানবিক বিপর্যয়েও আমাদের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সাংবাদিক ও অন্যান্য শ্রেনী পেশার মানুষেরা যে যার অবস্থান থেকে নিজের জীবনের ঝুঁকি কে উপেক্ষা করে দেশের আপামর জনসাধারণকে বাঁচানোর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কিন্ত তারপরও আমাদের আশে পাশে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা খুবই দুঃখজনক, হৃদয়বিদারক ও অমানবিকতার পরিচায়ক।এসব ঘটনা শুধু আমাদের মর্মাহতই করেনি বরং অনেকাংশে ভাবিয়ে তুলে।

গত কিছুদিন আগে টাঙ্গাইলের সখীপুরে করোনা সন্দেহে এক নারীকে জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে তার স্বামী-সন্তানেরা। মায়ের জ্বর-স্বর্দি-কাশি হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করারও প্রয়োজনবোধ করেননি সন্তানেরা। সন্ধ্যার সময় মা-কে নিয়ে বনের মধ্যে ফেলে আসলেন। আবার গত ২১ এপ্রিল করোনা আক্রান্ত সন্দেহে নারায়ণগঞ্জ থেকে এনে মাথার চুল কেটে সাভারে এক বৃদ্ধাকে ফেলে পালিয়েছে তার সন্তানরা।

সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওই নারীকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছেন। এদিকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে পিতাকে ফেলে পালিয়েছে সন্তানরা। সন্তানরা বাবার লাশ নিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সংবাদপত্রের পাতায় দেখা যায় সুনামগঞ্জে অন্য জেলা থেকে আসা গার্মেন্টসকর্মীর বাড়িতে যাওয়ার কারণে করোনা হয়েছে সন্দেহ করে বৃদ্ধা মাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন সন্তানরা। কিছুদিন আগে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে এক বৃদ্ধাকে হাসপাতালে ফেলে রেখে যায় তার স্বজনরা। এমনকি স্বজনরা তাকে হাসপাতালে ভর্তির সময় ভুল তথ্য দেয়, যাতে তাদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খুঁজে না পায়। বৃদ্ধা চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন।

পরে জানা যায় যে লোকটি ছিল আসলে স্ট্রোকের রোগী। অন্যদিকে বগুড়ার শিবগঞ্জে এক ব্যক্তি প্রচণ্ড জ্বরে অচেতন ও মুমূর্ষু হয়ে পড়েন। দিশেহারা হয়ে তার স্ত্রী সারারাত চেষ্টা করেও কারও সহযোগিতা পায়নি, একের পর এক হটলাইন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন, ডাক্তার ও পুলিশকে কল করলেও কেউই ডাকে সাড়া দেয়নি। তার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। অবশেষে তার স্বামীর মৃত্যু হয়। করোনা আতঙ্কে ভয়ে কেউ তার পরিবারের আকুতিতে সাড়া দেয়নি।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ডাক্তার শিল্পী আক্তারের পরিবারে একইসাথে ১৭ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়। এ সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পরলে এলাকার উচ্ছৃঙ্খল লোকজন বাড়ি থেকে তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। যে ডাক্তার করোনার মত মানবিক বিপর্যয়ের সময়েও মানুষ কে সহযোগিতা করেছে, তার প্রতি এলাকা বাসীর এমন আচরণ কখনোই কাম্য নয়। অবশেষে ইউএনও’র হস্তক্ষেপে উচ্ছৃঙ্খল লোকজনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে পরিবারটি।

অন্যদিকে আগ্রাবাদ মা-ও-শিশু হাসপাতাল এর একজন চিকিৎসক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ওঈট তে ভর্তি ছিলেন। অবস্থা অনেক খারাপ হওয়ায় উনাকে তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেলের আইসিউ তে পাঠানোর জন্যে এয়ার এম্বুলেন্স যখন আগ্রাবাদ, বহুতলা কলোনির মাঠে উপস্থিত হয়, তখন সেখানের এলাকাবাসীরা উনাকে সেই হেলিকপ্টারে উঠতে দেয়নি। অবশেষে তাকে না নিয়েই হেলিকপ্টারটি ফেরত যেতে বাধ্য হয়।সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসে পুলিশ পরিচয়ে করোনাভাইরাসের রোগী তল্লাশির নামে এক শিশুকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে দলবেঁধে গণধর্ষণের খবর।

মানবিকতার কি চরম বিপর্যয়? আর অন্যদিকে করোনা সন্দেহে হাসপাতালে জায়গা হয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীর। অবশেষে সে মারা যায়। মৃত্যুর আগে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে গেলে করোনার ভয়ে কোনো হাসপাতালই ভর্তি করেনি তাকে। রাস্তায় সন্তান প্রসবের ঘটনা শুনতে হচ্ছে আজকের এই দিনে।দায়িত্বরত কর্মীর অবহেলার কারণে গাইবান্ধা মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানা যায়, মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ১২ দিন ঘুরেও করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করাতে পারেননি আমিরুল ইসলাম। পরে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালের গেটে নিরুপায় হয়ে বসে থাকেন তিনি।

চট্টগ্রামে রাস্তায় পড়ে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন দুই ব্যক্তি, কিন্ত করোনা সংক্রমণের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় পড়ে ছিল হতভাগা দুই ব্যক্তির মৃতদেহ। এখানেও মানবতা ব্যর্থ। অবশেষে পুলিশ এসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।অন্যদিকে ঢাকা মেডিক্যালে করোনা শনাক্ত হওয়ায় এক শিশুকে নিতে হবে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে। কিন্ত করোনা আক্রান্ত ওই শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সের তোলার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত শিশুর বাবা তার সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে উঠান।সংবাদপত্র মারফত আরও জানা যায় টঙ্গীতে এক নারী অসুস্থ হয়ে রাস্তায় মারা গেলেও করোনা সন্দেহে তার মরদেহ ধরেনি সন্তানসহ এলাকাবাসী। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সড়কেই পড়েছিল ওই নারীর লাশ।

এসব ঘটনা দেখে শরীর শিহরিত হয় আর মনে প্রশ্ন জাগে করোনার এই ক্রান্তিকালীন সময়ে মানুষ নামক এই ভাইরাসগুলো সংক্রমিত করছে নাতো বিশ্ব মানবতাকে। আমরা কি শিক্ষা নিতে পারি না ভিক্ষুক নজিমুদ্দিন কাছ থেকে? হাঁ, আমি শেরপুরের ভিক্ষুক নজিমুদ্দিনের কথাই বলছি, যে তার জীবনের সবটুকু উপার্জন মাত্রও দশটি হাজার টাকা দিয়ে দিয়েছিল অসহায় কর্মহীন মানুষদের একটু ভালো থাকার জন্য । আমাদের কাছে তার দান মাত্র কয়েক হাজার টাকা হতে পারে কিন্ত তার কাছে ছিল ভিক্ষা করে তিলেতিলে জমানো সারা জীবনের সম্বল।মানবতা বেঁচে থাকুক চিরকাল নজিমুদ্দিনের মত আমাদের অন্তরে। আসুন আমরা সবাই করোনার এই ক্রান্তিকালীন মুহূর্তে মানবিক হই। মানবতা দিয়ে মোকাবেলা করি করোনার মত বৈশ্বিক দুর্যোগকে।সবার সুস্বাস্থ্য কামনায় এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকুক প্রিয় মানচিত্র।

লেখকঃ শিক্ষক ও গবেষক, আর্মি আইবিএ সাভার (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালস)