ঝিনাইদহে মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে একাধিক চলের কার্ড

প্রকাশিত: ৭:১৫ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২০
0Shares

মতিয়ার রহমান ঝিনাইদহ প্রতিনিধি :
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মধুহাটী ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের মৃত আব্দুল জলিলের স্ত্রী লাইলী বেগম। তিনি মারা গেছেন ১০/১২ বছর আগে। অথচ এই মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (৪৪১১৯৫২০৯০৪৯৫) ব্যবহার করে মধুহাটী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের একাধিক ব্যক্তি ১০ টাকা কেজি দরের চাল উত্তোলন করছেন।

মুসলিম জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে হিন্দু ও হিন্দু ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে মুসলমানদের তালিকা করা হয়েছে। এক গ্রামের জাতীয় পরিচয়পত্র অন্য গ্রামে ব্যবহার করা হয়েছে। নারীর আইডি দিয়ে পুরুষ আর পুরুষের আইডি ব্যবহার করে নারীর চালের কার্ড বানানো হয়েছে। এ ভাবে ওই ইউনিয়নে ১০/১২ জনের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অর্ধশত ব্যক্তির চালের কার্ড করা হয়েছে। চেয়ারম্যান, কতিপয় ইউপি সদস্য ও দুই ডিলার বছরের পর বছর ধরে জাল জোচ্চুরির মাধ্যমে গরীব মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত এই চাল নামে-বেনামে তুলে নিচ্ছেন। ইউনিয়নের দুই ডিলার নয়ন ও ইন্তা ওজনে কম দিচ্ছেন বলে উপকারভোগীরা অভিযোগ করেন।

সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিন তদন্ত করে এই দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। এদিকে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবর মধুহাটী ইউনিয়নের কুবিরখালী গ্রামের রফিকুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম ও দুর্গাপুর গ্রামের বদর উদ্দীন লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর চালের কার্ড হারানোর গন জিডি করা হয়েছে ঝিনাইদহ সদর থানায়। দুর্নীতি, অপকর্ম ও একজনের চাল অন্যজন তুলে নেওয়ার তথ্য আড়াল করার জন্য এই জিডি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ হাসনাত অভিযোগ তদন্তে রোববার মধুহাটী ইউনিয়ন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি অভিযোগকারীদের বক্তব্য রেকর্ড করেন। অনেকেই তার কাছে চাল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। তবে মধুহাটী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফারুক আহম্মেদ জুয়েল বলেছেন, ১২৪১টি তালিকা করতে গিয়ে কম্পিউটারে টাইপিং মিসিং হতে পারে।

এ গুলো সংশোধন করে বাদ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিন তদন্ত করে জানা গেছে, ১০/১২ বছর আগে মারা যাওয়া মৃত লাইলী বেগমের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে গোপালপুরের আব্দুলের ছেলে আমিরুল, একই গ্রামের রুহুল আমিনের স্ত্রী রেশমা খাতুন, আইয়ুব হোসেনের ছেলে মিন্টু মিয়া, মির্জাপুর গ্রামের ইসমাইলের ছেলে আক্তার হোসেন, নওদাপাড়া গ্রামের বিশারতের ছেলে মোশারেফ, বদর উদ্দীনের ছেলে নুর ইসলাম, কুবির খালী গ্রামের বুদোই মন্ডলের ছেলে কলিম উদ্দীন, একই গ্রামের জাবেদ আলীর স্ত্রী শাহেদা বেগম, ওয়াড়িয়া গ্রামের হালদারের ছেলে সম্ভু হালদার ও একই গ্রামের বদরের ছেলে বাবলুসহ একাধিক ব্যাক্তির নামে খাদ্য বান্ধব কর্মসুচির ১০ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সার্ভয়ারে লাইলী বেগমকে মৃত দেখানো আছে। তার জন্ম সাল ১৯৪০।

এদিকে মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চাল পাচ্ছেন লাইলী বেগমের ছেলে আবুল হোসেন আবুও। আবুলের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও তা নেওয়া হয়নি। লাইলী বেগমের পরিবার একজন মৃত মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির নামে চাল তোলার খবরটি শুনে বিস্মিত হন। মৃত লাইলী বেগমের পুত্রবধু আকলিমা খাতুন ও পোতা ছেলে আল আমিনের ভাষ্য এই অন্যায় কাজ যারা করেছে তাদের শাস্তি হোক। গোপালপুর গ্রামের শুধু মৃত লাইলী বেগমই নন ওই গ্রামের দত্তপাড়ার শচিন্দ্র নাথ দত্তের ছেলে অশোক কুমার দত্ত তিন বছর ধরে ঢাকার গাজীপুর চান্দুরা এলাকায় থাকেন। তার নামে খাদ্য বান্ধব কর্মসুচির চালের কার্ডও রয়েছে। তিনি এই কার্ডে চাল উত্তোলন না করলেও প্রতি মাসে তার নামের চাল কে বা কারা তুলে নিচ্ছে। অথচ অভাবের তাড়নায় দুই ছেলে অসিম ও নয়নকে নিয়ে অশোক দত্ত ঢাকায় চলে গেছেন। লেখাপড়া ছেড়ে তার দুই ছেলে এখন গার্মেন্টস কর্মী।

মুঠোফোনে কথা বলতে গিয়ে আশোক ও তার স্ত্রী শিখা রানী দত্ত কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা বলেন, চরম অভাবের তাড়নায় দুমুঠো ভাতের জন্য আমরা গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসেছি। অথচ আমাদের নামে কে বা কারা চাল তুলে খাচ্ছে আমরা নিজেরাও জানি না। অশোক দত্ত জানান, ২/৩ বছর আগে প্রতিবেশি চিত্ত দত্তের ছেলে বিপুল তার চালের কার্ড করে দিবেন বলে ছবি নেন। তার নামে কার্ড হলেও তিনি প্রতি মাসের ৩০ কেজি খাদ্য বান্ধব কর্মসুচির চাল পাচ্ছেন না বলে জানান অশোক। গ্রামে গিয়ে দেখা যায় অশোকের ফ্লাট বাড়িটি অযত্নে পড়ে আছে। নিজের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সব কিছু বিক্রি করলেও অবশিষ্ট ওই বাড়িটুকু আছে বলে স্ত্রী শিখা রানী দত্ত জানান। তথ্য নিয়ে জানা গেছে, অশোকের জাতীয় পরিচয়পত্র (৪৪১১৯৫২১৯২৯৩৪) ব্যাবহার করে তার ছোট ভাই তপন দত্ত ও বোন জোছনা রানীসহ চোরকোল গ্রামের আকবর আলীর ছেলে রমজান আলী, একই গ্রামের এজের আলীর ছেলে দশর আলী এবং মামুনশিয়া গ্রামের ইউসুফের ছেলে তক্কেল ও একই গ্রামের ইসরাফিলের স্ত্রী আকলিমার ১০ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড হয়েছে।

এছাড়া গোপালপুর গ্রামের মোজাম্মেল হকের স্ত্রী ফাতেমা বেগমের জাতীয় পরিচয়পত্র (৪৪১১৯৫২১৯১৯২২) ব্যবহার করে ওয়াড়িয়া গ্রামের এজের আলীর ছেলে তাইজেল, চোরকোল গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে বিপুল, আকবর আলীর ছেলে বরকত আলী, পানি মুন্সির ছেলে আরজান, নওদাপাড়া গ্রামের আহম্মেদ মন্ডলের স্ত্রী জাহেদা খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র (৪৪১১৯৫২১৯২৭৮১) ব্যবহার করে চোরকোল গ্রামের জামায়াত আলীর ছেলে রইচ, একই গ্রামের গোলক কুমারের ছেলে শ্রী বিমল কুমার, গোপালপুরের আব্বাসের ছেলে আইয়ূব, মাহাতাবের ছেলে ডালিম, গোপালপুরের আইয়ুব আলীর ছেলে মনিরুলের জাতীয় পরিচয়পত্র (৪৪১১৯৫২১৯২২৮৯) ব্যবহার করে সুধীর কুমারের ছেলে তপন কর্মকার, গোপালপুরের আনারুদ্দীনের ছেলে গাজিরুদ্দীন, নওদাপাড়ার সেকেল আলীর ছেলে শফি মুন্সি, একই গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে লিখন ও কুবির খালী গ্রামের মসলেমের ছেলে মোশাররফ।

গোপালপুর গ্রামের আবুল কাসেমের ছেলে সজিবরের জাতীয় পরিচয়পত্র (৪৪১১৯৫২১৯২৯৯৯) ব্যবহার করে ৪ জন, মনিরুদ্দীন মোল্লার ছেলে সাহেব আলীর জাতীয় পরিচয়পত্র (৪৪১১৯৫২১৯১৯৯৯) ব্যবহার করে ৪ জন, আব্বাস মন্ডলের ছেলে আইয়ুব হোসেনের ভোটার আইডি (৪৪১১৯৫২১৯১৫৮০) ব্যবহার করে ২ জন, বেড়াশুলা গ্রামের আব্দুল কাদের মন্ডলের ছেলে রবিউল ইসলামের ভোটার আইডি (৪৪১১৯৫২১৯৫৯২৭) ব্যবহার করে ২ জনের চাল তোলা হচ্ছে। এদিকে ৪৪১১৯৫২১৯১১৮৩ নাম্বারের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে গোপালপুরের আক্কাস আলীর ছেলে আশরাফুল, আব্বাস আলীর ছেলে মনোয়ার, মইনের ছেলে আলতাফ, চোরকোলের গোলাম মোস্তফার স্ত্রী মেহের বিবি, শফিকুল ইসলামের ছেলে ফেরদৌসি খাতুন, নওদাপাড়া গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে ইয়াছিন ও আটলিয়া গ্রামের আসাদুল ইসলামের ছেলে শিমুলসহ একাধিক ব্যক্তির নামে কার্ড করে চাল তুলে নেওয়া হচ্ছে।

তদন্ত করে দেখা গেছে মহামায়া গ্রামের মঙ্গল সরদারের মেয়ে সুন্দরী খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র কুবিরখালী গ্রামের মানিকের ছেলে স্বপন কুমারের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের খাদ্য বান্ধবের তালিকায় যার নাম ছিল ৩৯৪ ক্রমিকে। কুবিরখালী গ্রামের রমজান আলীর স্ত্রী শেফালী খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র নং দেখানো হয়েছে ৪৪১১৯৫২০০০০১৬। ঝিনাইদহ জেলা নির্বাচন অফিসে এই নাম্বারের কোন তথ্য মেলেনি। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্রটি ভুয়া। মহামায়া গ্রামের ছামছদ্দিন মন্ডলের ছেলে মিঠুন মন্ডলের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয়েছে শান্তিপদর ছেলে বাদলের নামে। বেড়াশুলা গ্রামের কালু মোল্লার ছেলে ওয়াদুদ মোল্লা নিজে এই চাল নিয়মিত পাচ্ছেন।

তারপরও ওয়াদুদ মোল্লার জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চাল তুলছেন নওদাপাড়া গ্রামের আখের আলীর ছেলে আব্দুল মালেক। কামতা গ্রামের ছামছুদ্দিন মোল্লার ছেলে ফারুকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চাল তুলছেন নাটু মন্ডলের ছেলে ফজলুর রহমান। বেড়াশুলা গ্রামের নাজমুল হুদার স্ত্রী জেলেনা খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে চাল তুলছেন নওদাপাড়া গ্রামের আবু সাইদের ছেলে ছানারুদ্দীন। বেজিমারা গ্রামের সামেদ আলীর ছেলে আবুল হোসেনের তালিকায় নাম রয়েছে ৬৩৯ নাম্বারে। প্রতি মাসে তার নামে চাল উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই কথা জানালেন বেজিমারা গ্রামের রেশমা ও মহামায়া গ্রামের ইন্তাজ আলী। আলফাজ উদ্দীনের ছেলে শরিফুলের নামে গোপালপুর ও নওদাপাড়ায় চাল উত্তোলন হচ্ছে।

তালিকায় তাদের নাম্বার যথাক্রমে ৫০৫ ও ১১৮১। কিন্তু তারা চাল পাচ্ছেন না। মধুহাটী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফারুক আহম্মেদ জুয়েল (০১৭৩৩-৪৬৯৯৪৪) বিষয়টি নিয়ে জানান, নির্বাচিত হওয়ার ১৫ দিন পর তড়িঘড়ি করে তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল। তাই তালিকা করতে গিয়ে কিছুটা ভুলত্রুটি হয়েছে। এখন বাদ দিয়ে সঠিক তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন এগুলো দেখার দায়িত্ব চেয়ারম্যানের তো একার না। খাদ্য কর্মকর্তা, ট্যাগ অফিসার ও ডিলাররা তো বিষয়গুলো যচাই বাছাই করে দিতে পারেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অভিযোগ নিয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বদরুদ্দোজা শুভ জানান, তার নজরেই এই অসঙ্গতি ধরা পড়ে। তিনি বলেন এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয় এক সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করেছেন।

রোববার তদন্ত করতে একজন ম্যাজিষ্ট্রেট ঘটনাস্থলে গেছেন। এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক ও মধুহাটী ইউনিয়নের বাসিন্দা আশরাফুল আলম জানান, অভিযোগকারীরা বিষয়টি আমাকে জানালে আমি নিজে তদন্ত করে দেখেছি চালের কার্ড করার পক্রিয়াটি খবুই অসচ্ছ ছিল ও দুর্নীতি করা হয়েছে। তিনি বলেন, রোববার তদন্ত কমিটির সামনেই ভুক্তভোগীরা বক্তব্য দিয়েছেন। তদন্তের পর দোষীদের বিরুদ্ধে কি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হয় সেদিকেই ইউনিয়নবাসি তাকিয়ে আছে।