ইঙ্গিত

প্রকাশিত: ৩:১০ অপরাহ্ণ, জুন ১৯, ২০২০
0Shares

 

 আসিফ ইকবাল আরিফ

(সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,জাককানইবি, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।)

চৈত্র কালের আজকের ভোরের সূর্যটা বেশ তরতাজা হয়েই উদীত হয়েছে। সূর্য তাপ শক্তি দ্বিগুন না বাড়লেও তাপ দেখে মনে হচ্ছে শক্তি চারগুন বেড়ে গিয়েছে।  সকাল সাতটাতেই যদি এই অবস্থা হয় না জানি দুপুর আসলে কি হবে তা বোঝা যাচ্ছেনা। যদি নিছক একদল সাদা মেঘ সূর্যটা কে খানিক সময় ধরে আবৃত করে না রাখে তাহলে আজ খবর বড়ই খারাপ হবে। খরতাপে আর গরমে শরীর আজ আধপাকা কাঁঠালের মত হয়ে যাবে।

 

মাটির ঘরের বারান্দায় বসে চার বছর বয়সের এক বাচ্চা ছেলে একটা হাড্ডি হাতে ধরে মনের আনন্দে দাঁত দিয়ে চিবানোর চেষ্টা করছে। হাড্ডির কাঠামো আর বাচ্ছা ছেলেটির হাত দিয়ে ধরার শৈলি দেখে মনে হচ্ছে এটা নির্ঘাত একটা মুরগীর ঠ্যাং। মানে মুরগীর পা। সাথে বাটিতে দু’চারটে পান্তা ভাতও আছে।

এমন সময় পাচুর মা ঘরের দুয়োরে এসে দাঁড়ায়। ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে পাচুর বউকে গলা ছেড়ে ডাকছে। বেশ কয়েকবার ডাক দেওয়ার পরে সে দেখে কিছু শুকনো ডালপালা নিয়ে ঘরের পাশেই রান্না ঘরে ঢুকলো পাচুর বউ। “পাচু গেছে কই? পান্তাভাত কি কিছু আছে না শেষ”? – এই কথা ছেলের বউকে উদ্দেশ্য করে বলে পাচুর মা।  পাচুর মায়ের বয়স এই ষাট বছরের মত হবে। পাচু ছাড়া তার কোনো সন্তান নেই।  পাচুর মায়ের কথা শুনে ঈষৎ তার দিকে চেয়ে পাচুর বউ সালেহা বলে, “সব ভাত শেষ। তোর ছেলে বিয়ান বেলা খেয়ে লাঙ্গলে গেছে। দু’চারডা ভাত যা ছিলো ঐগুলো দিয়ে ছোট ছেড়ারে বসাই দিইছি। ভাত রানতেছি। তুই একটু হুড়ুম খা”।

 

পাচুর মা এই কথা শুনে এক চিলতেও দেরি না করে ঘর থেকে একমুঠো হুড়ুম, মানে মুড়ি বের করে খাওয়া শুরু করলো। ইতোমধ্যে পাচুর ছোট ছেলে  মতিয়ারের খাওয়া শেষ হয়ে যায়। খাওয়া শেষ করে দাদীর কাছে এসে চুপ করে বসে থাকে। মুড়ি খেতে খেতে হঠাৎ দেখে কয়েকটি কাক গাছের ডালে বসে ডাকাডাকি করছে। কাকের ডাক যে বিপদের খবর বয়ে আনে তা এই অচিন্তপুর গ্রামের সব বয়সের লোকজনই কমবেশি জানে। “আমার পাচু কোন মাঠে রে গিয়েছে আতিয়ারের মা?” – কাকের ডাক শুনে পাচুর মা পাচুর বউকে বলে। “গড়ের মাঠে না কোন মাঠে গিয়েছে তা বলে যায়নি?” – এই উত্তর দেয় পাচুর বউ সালেহা। সালেহার উত্তর স্পষ্ট না হলেও পাচুর মা গড়ের মাঠের দিকে যাত্রা শুরু করে। সালেহা পিছন থেকে থামিয়ে বলে, “ইট্টু পরে যা। ভাত কয়ডা নিয়ে যাইছ”। কিছুক্ষণ দেরি করে ভাত নিয়ে মতিয়ারকে সাথে নিয়ে গড়ের মাঠে যায় পাচুর মা। কিছু পথ হাঁটতেই দেখে পাচুর মত কেউ একজন জমিতে হালচাষ করছে। দূর থেকে পাচুকে দেখে পাচুর মা খুব প্রশান্তি অনুভব করে। ঠিক যেমন বাচ্চা প্রসবকালীন সময়ে বাচ্চা প্রসব করার পরে কোনো মা প্রশান্তির নি:শ্বাস ফেলে এই রকম। “আল্লাহ আমার পাচুকে বাঁচায়ে রাখো। ওর যেন কোনো বিপদ আপদ না হয়। আমার মাথায় যে পরমায় চুল আছে আমার পাচুরে সেই পরমায় আয়ু দাও আল্লাহ”। – এই কথা সে বিড়বিড় করে বলে। পাচুর কাছে যেতেই পাচু বলে, “আজ এতো তাড়াতাড়ি আসলি যে মা”। পাচুর মা যে আজ কেনো এত তাড়াতাড়ি এসেছে তা কেবল তার মা-ই ভালো বলতে পারবে। যাইহোক, পাচু খাওয়া শেষ করে। ইতোমধ্যেই পাচুর চার বছরের ছেলে মতিয়ার অতি উৎসাহী হয়ে সাদা রঙের দামড়া গরুর লেজে হাত দিতেই মাথা ঘুরিয়ে মতিয়ারের দিকে তেড়ে আসে। ভয় পেয়ে চিৎকার করে পাচুর গায়ের উপর পড়ে। পাচু এক ধমক দিতেই ফ্যাল ফ্যাল করে কান্না করে দাদীর কাছে যায় সে।

 

পাচু খেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে গামলা আর বাটি গামছায় বেঁধে মায়ের হাতে দেয়। “ধারকান্দের ভেন্ডির ভু্ইটা (জমিটা) দেখে যাইস তো মা” – বলে পাচু লাঙ্গল বাইতে থাকে। পাচুর মা মতিয়ারকে সাথে নিয়ে ভেন্ডি বা ঢেঁড়শ ক্ষেতের দিকে যায়। ঢেঁড়শ ক্ষেতের কাছাকাছি যেতেই পাচুর মা কাচা রক্তের গন্ধ পায়। মনের মধ্যে তার আনচান আনচান করে। মতিয়ারকে জমির আইলে বসিয়ে রেখে সে রক্তের গন্ধ শুকতে শুকতে চলতে থাকে। এদিক-ওদিক খুঁজতেই ভেন্ডি ক্ষেতের মাঝখানে সে গরুর শিং দেখতে পায়। আর একটু সামনে গিয়ে জমাটবাঁধা রক্ত দেখে। তার আশে পাশেই গরুর দা্ঁত আর বড় বড় হাড় দেখে। এই দেখে পাচুর মা চিৎকার করলে আশে পাশের ক্ষেতে কাজ করা কয়েকজন ছুটে আসে। মতিয়ারও দাদীর চিৎকারে ভয় পেয়ে যায়। মতিয়ারকে কোলে নিয়ে ছুটে আসা ছানু মোল্লাকে বলে, “ঐ দ্যাখো, ভিতরে কারা যেন গরু জবাই করে হাড়গোড় ফেলে থুয়েছে”। এলাকায় গরু চোরের হার খুব বেড়েছে বলে দাবি করে ছানু মুন্সী। একটু পরে মনু মিয়া বলে যে গতরাতে বশার মোল্ল্যার গরু চুরি হয়ে গিয়েছে নাকি। যাইহোক, বশার মোল্ল্যা খবর পেয়ে আসে এবং গরুর দড়ি দেখে সে নিশ্চিত হয় যে তার গরুই চোরেরা জবাই করে খেয়েছে।

কাকের বিচলিত ডাক শুনেই পাচুর মায়ের মনে বিপদের শঙ্কা জাগে। আর এরই ফলশ্রুতিতে একটা বিপদ তার মাধ্যমেই চিহ্নিত হয়।

 

বশার মোল্ল্যার মাথায় হাত। চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা নিষ্পাপ অশ্রুজল বের হচ্ছে। কোন অজানা চোরে যে তার এত যত্নের গরুটাকে টুকরো টুকরো করে কেটেছে তা সে এখনো নির্ণয় করতে পারেনি। হাকিম ব্যাপারীর পরামর্শে আশে পাশের তিন গ্রামে কার কার বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের উপস্থিত থাকা ছাড়া গরুর মাংস রান্না হচ্ছে তা খুব গোপনে গুপ্তচরের মত ঘুরে ঘুরে খবর নেয় বশার মোল্ল্যা। এই সুত্র ধরে চোর ধরা গেলেও ধরা যেতে পারে বলে সে মনে করে।

 

বেলা প্রায় দুপুর হতে চললো। গ্রামের সব মানুষই প্রায়ই ঐ স্থানে জড়ো হয়। পাচুর মা বাড়ি ফিরলো। বাড়ি ফিরেই পেঁপে গাছে দেখে দুইটা হলদে পাখি খেলা করছে। “আজ আবার কোন কুটুম আসবে রে সালেহা”? – এই কথা বলে সে বাড়ি প্রবেশ করে। সালেহাও ইতোমধ্যে বশার মোল্ল্যার গরু চুরির কথা জানতে পেরেছে। “কোনো কুটমই আসবেনা। তুই ভাত খা। আমার কাজ আছে।“ – এই কথা বলে গম রোদে শুকায় ছালেহা। দু’য়েক মিনিট পরেই পাচুর শালা বাসায় এসে হাজির। সালেহা তড়িঘড়ি করে এসে জিজ্ঞেস করে তার ভাইয়ের এই ভর দুপুরে আসার কথা। “ছোট বুবুর আবার মেয়ে হয়েছে। তুগার (তোমাদের) মোবাইলে কল ঢুকছেনা। তাই খবর দিতে এলাম” – বলে উত্তর দেয় পাচুর শালা।লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মনভার করে বাড়ি ফেরে পাচু। গরু দু’টোকে গাছের ছায়াতে বেঁধে ঘরের বারান্দায় টেবিল ফ্যান পাশে নিয়ে বসে সে। শালার সাথে আলাপ করে গোসলে যায় সে। এরই মধ্যে পাচুর বড় ছেলে আতিয়ার বাড়ি এসেছে।  আতিয়ারের বয়স সতেরো বছর। লেখাপড়া আর কাজকর্ম কিছুই করেনা। খালি টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। যাইহোক, গোসল শেষ করে সবাইকে নিয়ে দুপুরের খাবার খায় পাচু।

 

আজ সবার মন বড্ড খারাপ! আর যাদের ঘরে গরু আছে তাদের মন আরও খারাপ!

 

বশার মোল্ল্যার গরুচুরির শোক নিয়েই অচিন্তপুর গ্রামে সন্ধ্যা নামলো। গ্রামের সবাই এখন সাবধান হতে লাগলো। রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে সবাই আবার ঘুমিয়ে গেলো।

 

মাঝ রাতে পাচুর মায়ের লাল কুকুরটি কেমন যেন বিকট শব্দ করছে। পাচুকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে কুকুরের কাছে যায় পাচুর মা। কুকুরের কাছে যেতেই পাচুর মা বলে, “এই কুকুরের মুখ বন্ধ করেছে চোরেরা, চোর তোর বাড়ীতেও আসপেনে” – কথা বলে পাচুকে বলে কাল সকালে আক্কাচ ফকিরের বাড়ি যেতে। পাচুর বউও ঘুম থেকে উঠে এসে ঘুমের ঘরে শ্বাশুড়ির কথায় সম্মতি দেয়।

 

পরদিন ঘুম থেকে উঠে দশ মেইল পথ সাইকেল চালিয়ে পাচু আক্কাচ ফকিরের বাড়ি যায়। আক্কাচ ফকিরের কাছে সব খুলে বলে সেখান একটা গাছের পাতা এনে কুকুরের নাকের ডগায় ধরলে কিছুক্ষণ পরে কুকুর আবার আগেরমত স্বাভাবিক চলাফেরা করতে শুরু করে।

 

পাচুর বৌয়ের খুব বায়না বোনের মেয়েকে দেখতে যাবে। গ্রামে গরু চুরির এমন উৎপাত দেখে পাচুর মা যেতে নিষেধ করে। আজ বিকালেই চলে আসবে বলে সালেহা শ্বাশুড়িকে কথা দেয়। বাপের বাড়িতে বোনের সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানকে দেখতে বাড়ি থেকে যাত্রা শুরু করে সালেহা।

ইতোমধ্যে বশার মোল্ল্যা তিন গ্রামের প্রায় ছয় পরিবার সনাক্ত করেছে যাদের বাড়িতে আত্মীয় স্বজন আসা ছাড়া গরুর গরুর মাংস রান্না  হয়েছে। সাধারণত আত্মীয় স্বজন না আসলে এরা গরুর মাংস রান্না করেনা। এই কাজ সে খুব গোপনে সম্পাদন করেছে বলে দাবি করে।

 

 

পাচুর বউ যখন বাপের বাড়ি যাচ্ছিলো তখন একই গ্রামের নিজাম তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো যে বাপের বাড়িতে কতদিন থাকবে সে। রসিকতার সাথে সে বলেছিলো যে সে প্রায় দুইমাস থাকবে।

পাচুর বউয়ের এই কথা নিজাম শোনার পর প্রায় ঘন ঘন পাচুর বাড়ির আশে পাশে ঘুরাঘুরি করছিলো।

এটা বশার মোল্ল্যার চোখে পড়াতেই সে পাচুকে সব খুলে বললো। “শোন পাচু, কোমরের ছুরিতেই কিন্তু কোমর কাটে। আমার গরু চুরি হওয়ার পরে যে যে বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের অনুপস্থিতিতে গরুর মাংস রান্দা হইছিলো, সেই বাড়ির মদ্দি কিন্তু নিজামের বাড়িও ছিলো। শুধু আমাগের গ্রাম থেকে নিজামের নামই আছে।“ – এই কথা বলে বশার মোল্ল্যা। বশার মোল্ল্যা আরও বলে যে পাচু যেন এমন ভাব নিয়ে শহরের দিকে নতুন জামা আর লুঙ্গি পরে যায় যাতে দেখে মনে হবে যে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে বউ আনতে।

 

যেই কথা সেই কাজ। পাচু সেজে গুজে শহরের দিকে গেলো। নিজাম আবার তাকে দেখে ফেলেছিলো। একদিকে পাচুর বউ বাড়িতে নেই আবার পাচুও নেই এমন সুযোগেই পাচুর গরু চুরি করার উত্তম সময়। আর কুকুরের মুখ তো আগেই বন্ধ করা আছে। অপরিচিত কেউ গেলে আর ঘেউ ঘেউ করবেনা। নিজাম তার চোর দলের অন্য সদস্যদের কাছে এই খবর পৌছিয়ে দিলো এবং আজ রাতে পাচুর গরু চুরি করার পরিকল্পনা করলো।

 

রাত প্রায়ই দশটার সময় পাচু আর পাচুর বউ বাড়ি ফিরলো। কোনো রকম কথা না  বলে চুপচাপ বাড়ি ঢুকে গেলো। পথে কারোর সাথে দেখা হয়েছে বলে মনে হয়নি। আর দুই একজন যারা দেখেছে তারা অন্তত নিজামের কাছে বার্তা পাঠানোর মত নয় আর কি।  এদিকে বশার মোল্ল্যাসহ আরও দুইজন পাচুর বাড়ি হাজির। আজ রাতে যদি চোর আসে তখন তারা ধরবে। পাড়ার বিশ্বস্ত বেশ কয়েকজনকে বলে রেখেছিলো আজ সজাগ থাকার জন্য। দড়ি টিতে না বেঁধেই গোয়াল ঘরের মধ্যে  একটা গরু রেখে দেয়। বাইরের দরজায় অবশ্য তালা লাগাতে সে ভুলে যায়নি।  পাচুর আর একটা গরুকে সে গোয়াল থেকে একটু দূরে কাঁঠাল গাছের  সাথে  বেঁধে রাখে। কাঁঠাল গাছে গরু বাঁধার কারণ পাচু, বশার আর তাদের সাথের দুইজনই জানতো। পাচু আর বশার যে চোর ধরার ফাঁদ পেতেছিলো, তা চোরেরা জানতো না।

 

“মা, আজ তোর ঘরের দুয়োরে কুকুরটাকে বেশি করে খাবার দিবি। আর একটু রাত জেগে থাকবি। কুকুর যেই বাইরের কোনো অপরিচিত মানুষের আওয়াজ পেয়ে ডাকাডাকি করবে তখন তুই একবার মাঝারি শব্দের কাশি দিবি” – এই কথা পাচু তার মাকে বলে। পাচু কাঁঠাল গাছের ডালে, বশার মোল্ল্যা গোয়াল ঘরের পাশে লেবু গাছের ঝোপের মধ্যে, বাকী লোকজন তাদের থেকে একটু দূরে সাবধানে অবস্থান করছিলো। সাপ আর পোকামাকড়ের ভয় থাকলেও আজ রাতে তারা এক একজন বীরপুরুষের মত সাহস বুকে জমিয়েছে। বশার মোল্ল্যার সাহস আরও বেশি। ‘জীবন গেলে যাবে তবুও গরু চোর ধরতে হবে’ – বিষয়টা অনেকটা এমনই ছিলো। যারা ওতপেতে চোর ধরার জন্য বসেছিলো, তাদের সবার হাতেই ধারালো রাম দা ছিলো আত্মরক্ষার জন্য। যাইহোক, মাঝরাত হয়ে গিয়েছে কিন্তু চোর এখনো আসেনি। হঠাৎ করে পাচুর মায়ের লাল কুকুর ডাকতে থাকে। পাচুর মা ঘরের মেঝের মাটিতে কান পেতে খুব সাবধানে হাঁটা চলা করা মানুষের ঈঙ্গিত পায়। কিছুক্ষণ অন্তর্জ্ঞান দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে তার সেই সাংকেতিক কাশি দেয়। কাশির শব্দ শুনে পাচু সাবধান হয়। চোর গোয়ালের পাশে এসেছে। গোয়াল ঘরে একটা গরু ঘুটঘুটে অন্ধকারে দেখতে পেলো। গোয়াল ঘরের টিনের ব্যাড়া কেটে গরু চুরি করলে ধরাপড়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই সে আর একটু এদিক-ওদিক দেখেনিলো। এমন সময় কাঁঠাল গাছে বাঁধা গরুটা খুক খুক করে কাশি দিয়ে শব্দ করলো। চোর সেখানে গিয়ে ভাবলো মনে হয় এই গরুটা কেউ গোয়ালে তুলতে পারেনি। সুতরাং চুরি করার জন্য চোর প্রস্তুত। চোরের অন্যান্য সহযোগীরা একটু দূরের মাঠের মধ্যে আছে। এই চোরের কাজ খালি গরুর দড়ি খুলে দেওয়া। তারপর গরু যদি কোনো রকম মাঠের দিকে আসে তাহলে সেই গরু সবাই মিলে তাড়া দিয়ে ধরবে। আর মাঠের দিকে যদি গরু না আসে তাহলে আজ তাদের মিশন সফল হবেনা।

 

চোর গরুর দড়ি খুলছে। চোরের কাছে কিছু অস্ত্র আছে কি নাই এইসব সাত-পাচ না ভেবেই গাছের ডাল থেকে জাপটে চোরকে ধরে চিৎকার করে পাচু। পাচুর চিৎকার শুনে লাফিয়ে আসতে গিয়ে পরনের লুঙ্গি খুলে যায় বশার মোল্ল্যার। লুঙ্গি খোলে খুলুক, তবে চোর সে ধরবেই। সবাই চোরকে ধরেই গাছের সাথে বে্ঁধে ফেললো। উলঙ্গ অবস্থায় না থেকে বশার মোল্লা লুঙ্গিটা কুড়িয়ে পরে নিলো। চোর পাচুর হাতে কামড় দিয়ে মাংস তুলে নিয়েছে তারপরেও সে চোরকে ছাড়েনি। নিজের জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে সে ধরে রেখেছিলো।

বশার মোল্ল্যা আর পাচুর কৌশলী জালে চোর ধরা পড়লো। আর এই জন্যই বলে ‘চোরের দশদিন আর গেরস্তের একদিন’। সবাই একসাথে একমনা হয়ে থাকলে অপরাধ কমানো যায় তা এই কয়জন দেখালো। যাইহোক, যে চোর ধরা পড়েছিলো সে নিজাম না। অন্য গ্রামের। মন্ডল আর মাতবরের উপস্থিতিতে দুই বাঁশের মাঝখানে পা রেখে চাপ দিতেই প্যাড়পেড়িয়ে সব স্বীকার করলো সে। বশার মোল্ল্যার গরু আর পাচুর গরু চোরের মুল নায়ক ছিলো অচিন্তপুরেরই নিজামই। যাইহোক, বিচার সালিশ বসানো হলো। সব চোর ধরা পড়লো। বশার মোল্ল্যাও ক্ষতিপূরণ পেলো।

 

পাচু, বশার মোল্ল্যা আর পাচুর মা সহ যারা চোর ধরার জন্য কাজ করেছিলো, গ্রামের সবাই তাদের অনেক প্রশংসায় ভাসাচ্ছে। তবে যেইদিন ভোর সকালে একপাল শকূন বাড়ির উঠনে বসেছিলো, আর দুপুর বেলায় পাচুর বাবা  ধরাশয় ছেড়ে গিয়েছিলো, ঠিক সেইদিন থেকেই প্রকৃতির বিভিন্ন ঈঙ্গিতের ভাষা পাচুর মা বুঝতে পারে। হতে পারে ঐ সমস্ত ঈঙ্গিতের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার মিল কাকতালীয়। পাচুর মা এইগুলো মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এবং তা ধারণ করে। এইগুলোই তার কাছে বিজ্ঞানের মত। এইগুলো তার জীবন অভিজ্ঞতার জ্ঞান। কেউ কুসংস্কার বললে বলতেই পারে। এতে তার বিশ্বাস একচুল পরিমাণও কমবেনা।

 

পাচুর মায়ের অন্তর্জ্ঞান দৃষ্টি প্রকৃতিতে ঘটে যাওয়া অনেক বিষয়ের  ঈঙ্গিত বাস্তব জীবনের চিহ্ন বহন করে। লোকের জীবনের লোক বিশ্বাস দিয়েই সেখানকার মানুষ জীবন চালিয়ে থাকে। আর পাচুর মায়ের মত একজন বয়স্ক মানুষ সেই পরিবারে বটবৃক্ষ হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

 

গরু চোরের বিচার হয়েছে। দু’য়েক বছর হয়তো আর কেউ এই গ্রামে গরু চুরির সাহস দেখাবেনা। সবাই স্বস্তিতে যে যার বাড়িতে ফিরে গেলো।