লঞ্চের ধাক্কায় নৌকা ডুবি, কান্না থামছে না শিশু তানহার!

প্রকাশিত: ১০:০৬ অপরাহ্ণ, জুন ১৯, ২০২০
0Shares

এম.নাজিম উদ্দিন,পটুয়াখালী:
ফিটার ফিডিংয়েও কান্না থামছে না শিশু তানহার। দেখছেনা বাবা-মাকে। বৃহস্পতিবার ভোরে নুরাইনপুর লঞ্চঘাটে ঢাকা-কালাইয়া রুটের যাত্রীবাহী লঞ্চ ঈগল-৪ এর সঙ্গে একটি খেয়া নৌকা ধাক্কা লেগে উল্টে নৌকার যাত্রীরা নদীতে পড়ে গিয়ে শিশু তানহার বাবা আসলাম ও জান্নাত নিখোঁজ হন। এ সময় আনোয়ার নামে অপর একজন উদ্ধার হওয়ার পরে মারা যায়। একদিন পর আজ শুক্রবার বিকালে ঘটনাস্থলে লাশ ভেসে উঠল আসলামের। জান্নাতের লাশের সন্ধান পাওয়া যায় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দুরে আলগী-তেঁতুলিয়া নদীর মিলনস্থল তালতলী পয়েন্ট এলাকায়।
আট মাস বয়সী শিশু তানহার ভাব প্রকাশের সক্ষমতা না থাকলেও দৃষ্টিতে যেন বাবা-মা হারানোর এক অবর্ণণীয় অসহায়ত্ব প্রকাশ আর ¯^জনদের আহাজারি শুনে কেবলই মুখে লেগে থাকা তার অহরহ কান্নার শব্দ। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে মেয়ে তানহাকে নতুন জামা-মোজা পড়ানোর ¯^প্ন ভেসে যায় পটুয়াখালীর বাউফলের আলগী নদীতে লঞ্চের ধাক্কায় নৌকা ডুবিতে নিখোঁজ দম্পত্তি আসলাম-জান্নাতের।

নিখোঁজদের ¯স্বজন ও স্থানীয়রা জানায়, আসলাম-জান্নাত দম্পত্তি কেশবপুর ইউপির ভরিপাশা গ্রামে বাড়ি থেকে লকডাউনে ফেলে আসা বকেয়া বেতন তুলতে চার দিন আগে রওনা হয়ে যান নারায়নঞ্জের সিদ্দিকগঞ্জ ইপিজেড এলাকার জানাতের কর্মস্থল একটি গার্মেন্টের উদ্দেশে। কর্তৃপক্ষের লোকজনের আশ^াসে সেখানে ছুটে গিয়েও বেতন তুলতে ব্যার্থ হয়ে দেঁড়ি না করে পূন:রায় উঠে বসেন এমভি ঈগল-৪ লঞ্চের ডেকে বাড়ি ফেরার উদ্দেশে দাদি আলোমতির কাছে (আসলামের মা) রেখে যাওয়া তাদের একমাত্র শিশু সন্তান তানহার টানে। সঙ্গে হাতে পাওয়া একই এলাকায় আসলামের দিনমজুরীর কিছু বকেয়া আর লঞ্চের ভাড়া বাদে দু’জনার হাতে থাকা অবশিষ্ট সামন্য টাকায় কিনে নেন তারা আটমাস বয়সী প্রিয় শিশু সন্তান তানহার জন্য নতুন জামা-মোজা। কিন্তু নিজ স্টেশন নুরাইনপুর ঘাটে নেমে আরো ১০-১২ জনের সঙ্গে খেয়ার নৌকায় উঠে আলগী নদী পাড় হতে গিয়ে ফিরে আসা ওই লঞ্চের ধাক্কাতেই লন্ডভন্ড হয়ে যায় শিশু তানহাকে নতুন জামা-মোজা পড়ানো ¯^প্ন। খেয়ার নৌকা উল্টে নিখোঁজ হন ওই আসলাম জান্নাত দম্পত্তি। তাদের শিশু তানহার জন্য কেনা নতুন জামা-মোজা ভর্তি ট্রাবেল ব্যাগটি পানিতে ভেসে যাওয়ার সময় উদ্ধার করা গেলেও উদ্ধার করা যায় নি আসলাম-জান্নাত দম্পতিকে। এ সময় আনোয়ার নামে অপর একজন উদ্ধার হওয়ার পরে মারা যায়। লঞ্চের ইঞ্জিনের প্রপেলারের দাপটে পানিতে নিখোঁজ হয় আসলাম ও জান্নাত দুই জন। আজ শুক্রবার বিকালে ঘটনাস্থলে লঞ্চঘাটের পন্টুনের সঙ্গে আসলামের লাশ ভাসতে পাওয়া যায়। জান্নাত বেগমের লাশ মেলে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে আলগী-তেঁতুলিয়া নদীর মিলনস্থল তালতলী পয়েন্ট এলাকায়।

লঞ্চের ধাক্কায় নৌকা ডুবিতে নিখোঁজ হওয়ায় দম্পত্তি আসলাম-জানানাতের আত্মীয়-স্বজনসহ এলাকায় নামে শোকের ছায়া। নাতি তানহাকে কোলে নিয়ে আসলামের মা আলোমতি বিলাপ করছেন। পানিতে ভেসে যাওয়ার সময় উদ্ধার হওয়া ট্রাবেল ব্যাগে পাওয়া নাতি তানহার জন্য তার ছেলে ও ছেলের বৌয়ের কেনা নতুন জামা-মোজা দেখাচ্ছেন আর বলছেন ‘তোমরা আমার ছেলেডারে আইন্যা দেও।’ আসলামের বাবা আলম শরিফ বাকরুদ্ধ হয়ে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে কেবল তাকাচ্ছেন এদিক-সেদিক। শান্তনার চেস্টায় তাকে তাদেরকে ঘিরে আশপাশের লোকজন। লঞ্চ স্টাফদের অসতর্কতার কারণে নৌকা ডুবির ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবী করেছেন আজ শুক্রবার দুপুরেও ঘটনাস্থলে নদীর পাড়ে কান্নায় ভেঙে পড়া জান্নাতের বাবা পৌর সদর এলাকার জালাল মোল্লা ও মা সাজেদা বেগমও। কান্না জড়ানো সাজেদা বেগম জানান, বছর চারেক আগে বিয়ে হয় আসলাম ও জান্নাতের। টানাটানির সংসার গ্রামে থেকে কোনমতে চলছিল না। তাই মেয়ের জামাই আসলাম নারায়নগঞ্জে দিনমজুরী আর একই এলাকায় মেয়ে জান্নাত গার্মেন্টে কাজ করছিলেন। নাতি তানহা আসার পরে ভাড়ার বাসায় থেকে তাকে দেখভালের কাজ করলেও এখন এ অবস্থায় নাতিটাকে রাখা যাচ্ছে না। গার্মেন্টে কাজের সময় বিরতিতে বাসায় এসে মেয়ে তানহাকে দুধ খাইয়ে যেত জান্নাত। করোনার লকডাউনে বাড়ি এসে গার্মেন্ট মালিক পক্ষের কথা মতো তানহাকে তার দাদির কাছে রেখেইে বেতন তুলতে যায় ওরা দু’জন। এখন ফিটার ফিডিংয়েও ¯^াচ্ছন্দ নেই। রাখা যাচ্ছে না কোন মতে। কোন কিছু না বুঝলেও কান্না করছে আহরহ। কিছু না বুঝলেও মায়ের অনুপস্থিতিতে অস্থির হয়ে উঠছে শিশু তানহা। দূর্ঘটনার সঠিক তদন্ত করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

লঞ্চের ধাক্কায় নৌকা ডুবিতে আসলাম-জান্নাত দম্পতিসহ তিন জন নিহতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেছেন স্থানয়িরা। সেলিম, জালাল চৌকিদার, শাহআলম হাওলাদার, আবুল কালাম, আলমগীর হোসেন, নান্নু নামে কয়েকজন প্রায় অভিন্ন বলেন, ‘লঞ্চের ড্রাইভার (মাষ্টার) হানিফ মিয়াসহ লঞ্চ স্টাফদের অসতর্কতার মতো কারণেই এমন দূর্ঘটনা ঘটেছে।’
এ ঘটনায় প্রশাসনের লোকজনের উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা ছিল না উল্লেখ করে এরা জানান, এতবড় একটা দূর্ঘটনার পরে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা কিংবা থানার ওসি একবারের জন্যও বাড়িতে এসে এই ছোট্ট শিশুটির খোঁজ নেননি। ঘটনাস্থলেও আসেননি কোন উর্ধ্বতন কর্তা ব্যাক্তি। উপরন্তু স্থানীয় লোকজন লঞ্চটিকে আটক করলেও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে তা আবার ছেড়ে দেওয়া হয়। লাশ উদ্ধারের ব্যাপারেও প্রশাসনের তেমন কোন ভূমিকা ছিল না।’

অভিযোগ অস্বীকার করে এমভি ঈগল-৪ লঞ্চটির ড্রাইবার হানিফ মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘নদীর স্রোতে নৌকা এসে লঞ্চের সঙ্গে থাক্কা খায়।’ তার দাবি লঞ্চ ঘাটে নোঙর করা ছিল। এখানে তার অসাবধানতার কিছু ছিল না। লঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর মো.আলমগীর হোসেন বলেন, ‘লঞ্চ ঘাটে নোঙর করা ছিল। নৌকা লঞ্চে ধাক্কা লাগে নি।’
বাউফল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘লাশ উদ্ধারে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। আগের দিন শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনা স্থলে পুলিশ পাঠানো হয়।’

উল্লেখ, লঞ্চের থাক্কায় নৌকা ডুবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) নুরাইনপুর লঞ্চঘাটের অদূরে খেয়াঘাট এলাকায় আলগী নদীতে আনোয়ার হোসেন (৩২) নামে এক যুবক নিহত হন। নিখোঁজ হন আসলাম-জান্নাত দম্পত্তি।