ছয় মাস পর টাকা ছাপিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দিতে হবে—আহসান এইচ মনসুর

প্রকাশিত: ২:৪৬ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০
0Shares

অনলাইন ডেক্স: সরকার যেভাবে চলছে তাতে ছয় মাস পর টাকা ছাপিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দিতে হবে। সরকার গতানুগতিকভাবে বাজেটে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিয়েছে। আর এবার রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর গতকাল ‘সিপিডি বাজেট সংলাপ ২০২০’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সংলাপে এ কথা বলেন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ ভার্চুয়াল সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। সভাপতিত্ব করেন সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। আলোচনায় আরো অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) অনারারি প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি নিহাদ কবির প্রমুখ। সংলাপে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

সংলাপে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা যে বাজেট আশা করেছিলাম, সেটা বৈশ্বিক মন্দা বা দেশের সব সেক্টরে কভিড-১৯-এর যে প্রভাব, তার পরিপ্রেক্ষিতে। আরেকটি বিষয় হলো, কভিড-১৯-এর আগেই দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে অনেক ধরনের সমস্যা ছিল। পুঁজিবাজারে সমস্যা ছিল। কিন্তু কভিডের পর সমস্যাগুলো আরো বেশি ঘনীভূত হয়েছে। কিন্তু আমরা রুটিন বাজেট আশা করিনি। বিশেষ পরিস্থিতিতে একটা বিশেষ বাজেট হবে। তবে রুটিন বাজেটেরও অংশ থাকবে। সেদিক থেকে এত আয় আনা অনেক কঠিন হবে। বাজেটে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ দরকার ছিল। আর এনবিআরের সংস্কার দরকার। অনলাইনে ভ্যাট আদায়, নতুন লোকজন ট্যাক্সের আওতায় আসবে এমন কথা শুনছি। এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা দরকার।

ড. আহসান হাবিব মনসুর বলেন, আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে বলেছি, এ বছরে বার্ষিক বাজেট করাটা অযৌক্তিক হবে। আমাদের দুটো বাজেট করা দরকার ছিল। জুলাই-ডিসেম্বর এরপর ডিসেম্বর-জানুয়ারি। ফোকাসটা হওয়া উচিত ছিল কভিড-১৯ কন্ট্রোল, নতুন করে যারা চাকরি হারিয়েছে, তাদের সোস্যাল সেফটিনেটের আওতায় নিয়ে আস আর প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা। এ জায়গাগুলোয় ফোকাস করলেই যথেষ্ট ছিল। ফোকাসটা জিডিপিকে কেন্দ্র না করে, ইস্যুকেন্দ্রিক করা হোক। কিন্তু সেটা হয়নি। কিন্তু তার পরও আসছে বাজেটে প্রথম ছয় মাসকে আলাদা করে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, কিন্তু সরকার যেভাবে চলছে তাতে ছয় মাস পর টাকা ছাপিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দিতে হবে। সরকার গতানুগতিকভাবে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিয়েছে বাজেটে। আর এবার রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কর পরিধি বাড়ানোর জন্য আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুই ভাগে ভাগ করার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সরকার তা করেনি। এনবিআরের কাঠামোকে সংস্কার করতে বলেছিলাম। কিন্তু তা বাস্তবে করা হয়নি।

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ প্রশংসনীয়ভাবে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পেরেছে। কিন্তু এ মুহূর্তে দরকার ছিল সংস্কারের পদক্ষেপ। এ বছরই তা সম্ভব হবে, তা নয়। আগামী কয়েক বছর ধরে তা করা সম্ভব ছিল। পাশাপাশি ঝুঁকি মোকাবেলার প্রস্তুতিও দুর্বল। এ পরিস্থিতিতে বাজেট কয়েক মাস পর পর সংশোধন করা যেতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতের টাকা ব্যয়ের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যয়ের ৩১ শতাংশই যায় সঞ্চয়পত্রের সুদ বাবদ, কিন্তু তা কখনোই এর আওতায় দেখানো হয় না।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, করোনা এখনো চলমান। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে তা প্রতিরোধ এবং করোনা-পরবর্তী যথাযথ কোনো পদক্ষেপ দেয়া হয়নি। ফলে শুরুর ছয়-সাত মাসকে প্রাধান্য দিয়ে রিভাইজড বাজেট করার পাশাপাশি চলমান বাজেটে রাখা স্বাস্থ্য ও শস্য বীমার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার। তাহলে দেশের মানুষ ও কৃষকরা দ্রুত করোনা মোকাবেলায় সক্ষম হবে। সুতরাং প্রবৃদ্ধি ও ধারাবাহিকতার কথা চিন্তা না করে সংস্কার বাড়িয়ে করোনা ঝুঁকির বাস্তবতা কমানো দরকার।

১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা দেয়ার বিষয়টিকে নৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক— কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছে সিপিডি। এ বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আগেও দেয়া হয়েছে। তাতে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা এসেছে। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এসেছে ৯ হাজার কোটি টাকা। সুতরাং এ সুবিধা দিয়ে কোনো লাভ হয়নি। এ সুবিধা দেয়াটা ঠিক হয়নি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চলমান এ সংকট পুরো বিশ্বকে একসঙ্গে গ্রাস করেছে, যার কারণে আমাদের অর্থ ব্যবস্থার পুরো বিষয়কে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হচ্ছে। আমি মনে করি অর্থ খাতকে সংস্কার করার এখনই একটা ভালো সময়।

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো কোনো খাতকে অবহেলা করা হয়েছে, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। আমরা কোনো খাতকে অবহেলা করিনি। বাজেটে মেগা প্রজেক্টগুলোয় অর্থায়ন নিয়ে অনেকে সমালোচনা করছে। কিন্তু তাদের অনেকেই দেখছে না, এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে কতটা ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, এনবিআরের রাজস্ব আহরণ নিয়ে অনেকে অনেক ধরনের মন্তব্য করে থাকেন, আমরা আশা করব যৌক্তিক পরামর্শ দিয়ে আপনারা তাদের সহযোগিতা করবেন। আরেকটা কথা আমাদের বাজেটে সব কি নিরাশার? বিষয়টা তো তেমন না। সে বিষয়গুলোও আলোচনায় আসা দরকার। অনেকে বলছে, আমরা জিডিপির গ্রোথ ম্যানিয়ায় ভুগছি, আমরা কিন্তু অমন কিছুতে ভুগছি না। যাদের নিয়ে আমরা রাজনীতি করি, তারা বিষয়টা জানতে চায়। আর কিছু বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান জিডিপি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করে, আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, আসছে বছরের প্রস্তাবিত যে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, সেটার বাস্তবায়ন এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ। এর মধ্যে আলাদা করে বলতে গেলে প্রণোদনা প্যাকেজ, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, কভিড সমস্যার স্থায়ী সমাধান—এসব বিষয় নিয়েই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা দরকার।