এবার আসল স্বাদে ভারতীয় ইলিশ, বঞ্চিত বাংলাদেশ!

প্রকাশিত: ৩:০১ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০
0Shares

অনলাইন ডেক্স: লকডাউনের প্রভাব পড়েছে নদীর ইলিশে। তবে এবার ক্ষতিকর ভাবে নয়। বরং নিজের ঐতিহ্য ফিরে পাচ্ছে ইলিশ। ইলিশের নামের সাথে যে স্বাদ ও গন্ধ জড়িয়ে আছে, এতদিন তা লুকিয়ে ছিল। লকডাউনের কারণে ইলিশ ফিরে পাচ্ছে তার নিজস্ব স্বাদ ও গন্ধ। এমনটাই বলছেন ভারতীয় গবেষকরা।

ডিম পাড়ার সময় ইলিশ গভীর সমুদ্রের নোনা জল থেকে নদীতে আসে। পোনার মাপ ৩-৪ ইঞ্চি হওয়ার পর তারা ফের সমুদ্রের দিকে ফিরতে শুরু করে। বর্ষায় ও শীতে মোহনা থেকে গঙ্গা বেয়ে ফরাক্কা পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পথ যায় ইলিশের ঝাঁক। এই যাত্রাকে পরিযান বলে। পানি পরিষ্কার থাকলে এই পরিযান হয় যথাযথ। আর ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ এক প্রান্ত থেকে দৌড়ে বেড়ায় অন্য প্রান্তে। লকডাউনের কারণে এই পরিযানই এ বার ইলিশের জন্য এতটাই সুখকর হবে যে, তার প্রভাব পড়বে স্বাদে-গন্ধে-আকারে।

সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিআইএফআরআই)-এর নদী-মৎস্য বিভাগের সাবেক প্রধান ইলিশ-বিশেষজ্ঞ উৎপল ভৌমিক বলছেন, ‘‘পানির মান এবং ভাল খাবার সব সময়েই মাছের জন্য অত্যন্ত ভাল। পরিযানের পথে এবার গঙ্গার ইলিশ সেটাই পাবে। যার নিট ফল, স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় হয়ে ওঠা।’’

লকডাউনে বন্ধ কলকারখানাগুলো। নদীতে চলছে না নৌযানও। জেলেদের থামিয়ে দিয়েছে ঝড় আমফান। এসব কারণে, গঙ্গায় দূষণের পরিমাণ এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গেছে। অপরদিকে বৃষ্টিতে নদীর পানির অবস্থা ভাল। সব মিলিয়ে গঙ্গার পরিষ্কার পানির কারণেই ইলিশের পরিযানের পথ অত্যন্ত সুখকর হয়ে উঠবে এ বছর। শুধু পরিযানের পথ নয়, পরিষ্কার পানির কারণে এবার গঙ্গায় মাছের খাবারের পরিমাণও বেড়েছে অনেক গুণ।

কিন্তু তার সঙ্গে স্বাদ ও গন্ধের বৈজ্ঞানিক কোনো সম্পর্ক আছে? আছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রের নোনা জল থেকে ইলিশ যত নদীর উজানে যেতে থাকে ততই তার শরীর থেকে ঝরতে থাকে আয়োডিন, লবণের মতো খনিজ পদার্থ। পরিযানের সময়ে ইলিশ কিছু খায়ও না। তাই ইলিশ যত বেশি মিষ্টি জলে থাকতে পারবে, তত তার দেহ থেকে কমবে লবণসহ বিভিন্ন খনিজ। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তার স্বাদও। বিশেষজ্ঞ উৎপল ভৌমিক বলেন, ‘‘ইলিশের অনন্য স্বাদের একটা কারণ কিন্তু স্নেহপদার্থ বা ফ্যাট অর্থাৎ আমরা যেটাকে তেল বলি। অন্য মাছের ক্ষেত্রে এই তেল তাদের পেটের অঙ্কীয়দেশে জমা হয়। কিন্তু ইলিশের ক্ষেত্রে সেটাই তার সারা দেহে, পেশী-কলা-কোষের পরতে পরতে সুষম ভাবে বিন্যস্ত থাকে। সে কারণেই এত স্বাদু ইলিশ।’’ দূষণের সঙ্গে ইলিশের স্বাদের সম্পর্ক সরাসরি না থাকলেও, রয়েছে তো বটেই। এ বছর নদীর জল পরিষ্কার বলে ইলিশ গঙ্গা বক্ষ ধরে দৌড়বে অনেকটা। মিষ্টি-পরিষ্কার-দূষণহীন জলে তার শরীর থেকে আয়োডিন-লবণের মতো খনিজ পদার্থ দ্রুত ঝরতে থাকবে। সামুদ্রিক উপাদান যত তার শরীর থেকে ঝরবে, ততই ইলিশের স্বাদের মান বাড়বে। আবার পরিযানের সময় ইলিশ যেহেতু কোনো খাবার খায় না, তাই গোটা যাত্রাতেই সে তার শরীরে জমানো স্নেহপদার্থ খাবারের বিকল্প হিসেবে খরচ করতে থাকে। ইলিশদের পরিযানের এই হাইওয়েতে এত দিন নানা বাধাবিপত্তি ছিল। এ বছর সে সব কেটে গিয়ে একেবারে ফাঁকা ময়দান।

এতো গেল ভারতের গঙ্গার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ? বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের পাশাপাশি মিয়ানমারের ইরাবতী নদীর মোহনাতেও ইলিশ পাওয়া যায়। কিন্তু সেই ইলিশ আকারে বড় হলেও স্বাদের দিক থেকে তা গঙ্গার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না বলে দাবি ভারতীয় গবেষকদের। তারা বলছেন, ইলিশের পরিযানের জন্য তার চলার পথ অন্তত চল্লিশ ফুট গভীর হতে হয়। জলের প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ বাধা পায়। তাই ইলিশ হামেশাই বাধ্য হচ্ছিল মোহনায় ডিম পাড়তে। এটা কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী। এতে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হয়। আর স্বাদও কমে। ‘‘অনুকূল পরিবেশ ও খাদ্যের তারতম্যে তো ইলিশের স্বাদ বদলায়। সে কারণেই ইরাবতীর থেকে গঙ্গার ইলিশ অনেক এগিয়ে। সব মিলিয়ে এ বছর যে ইলিশ ভারতের বাজারে আসবে, তা কিন্তু স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়ই হবে।’’ একই কথা বলছেন ভারতের নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকার। নদীর জলের মান, নদীতে মাছেদের খাবার এবং তাদের স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করতে হয় তাকে। তিনি বলছেন, ‘‘ইলিশের স্বাদ মূলত দুটো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। মাছের খাবার আর পানির গুণগত মান। এ বছর গঙ্গায় দুটোই ইলিশের জন্য অনুকূল। কাজেই এ বার কিন্তু ইলিশের স্বাস্থ্য ও স্বাদ ভাল হবে, সেটাই স্বাভাবিক।’’

সূত্র: দেশদর্পণ