নকলায় মৃগী নদীর ভাঙনে ছোট হচ্ছে স্থলভাগের মানচিত্র! নেওয়া হচ্ছেনা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

প্রকাশিত: ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০
0Shares

মো. মোশারফ হোসাইন, শেরপুর প্রতিনিধি:

বর্ষার শুরুতেই শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়ন ও চরঅষ্টধর ইউনিয়নের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা মৃগী নদীর দক্ষিণ তীরে ভাঙনের ফলে দিন দিন ছোট হচ্ছে নকলার স্থলভাগের মানচিত্র। প্রতিবছর ক্রমবর্ধমান ভাঙনে উপজেলার চন্দ্রকোনা ও চরঅষ্টধর ইউনিয়নের শত শত পরিবার তাদের ফসলি জমি ও ভিটেবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

ভাঙন রোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বহুবার আবেদন করেও কোন লাভ হয়নি। নেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এখন পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়নি ফসপ্রসূ বা উল্লেখযোগ্য কোন উদ্যোগ। ফলে নকলা উপজেলার মৃগী নদীর দক্ষিণ তীরে বসবাসরত অগণিত সাধারণ মানুষের জীবনমান আজ হুমকির সম্মূখিন।

সরজমিনে দেখা গেছে, এরই মধ্যে গত কয়েক বছরে কয়েকশত একর আবাদী জমি, শতাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, কবরস্থানসহ অনেকের স্বপ্ন এ নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাছাড়া হুমকির মুখে রয়েছে চরঅষ্টধর ইউনিয়নের দ্বিতীয় বারের মতো স্থানান্তরিত হওয়া ৪১নং নারায়খোলা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অনেক ঘরবাড়ী, কৃষি আবাদী জমি, রাস্তাঘাটসহ অনেক কিছু। চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের বেতমারি, চরবাছুর আলগী ও জামালপুর জেলার হালগড়া চরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার জনগণের যাতায়াতের একমাত্র সড়কের বেশ কিছু অংশ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে চড়ম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এসকল এলাকার হাজারো মানুষের। দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয় বাসিন্দা ছামিউল হক খানের মতো অনেকেই নিজের ঘরবাড়ি অন্যত্র স্থানান্তর করে ফেলেছেন।

অনেক এলাকাবাসী অভিযোগের সুরে জানান, স্থানীয় এমপি সাবেক কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চেীধুরীকে বিষয়টি জানানোসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বহুবার আবেদন করার পরেও নদীর ভাঙন রোধে সরকারি ভাবে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই সাবেক কৃষি মন্ত্রী নকলা-নালিতাবাড়ীর এমপি বেগম মতিয়া চৌধুরী ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের কৃতি সন্তান সড়ক ও সেতু মন্ত্রাণালয়ে সচিব নজরুল ইসলাম মহোদয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছেন এলাকাবাসী। তাছাড়া মৃগী নদীর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা বিভাগের উর্ধ্বতনদের নজরে আনতে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রচার ও প্রসারের জন্য সংবাদ কর্মীদের বিশেষ ভাবে অনুরোধ জানান এ নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত সর্বস্তরের জনগণ। ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করতে বা নকলা উপজেলার মানচিত্র ঠিক রাখতে হলে এখনই মৃগী নদীর রক্ষা বাঁধ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তানা হলে হয়তবা একদিন নকলা উপজেলার কয়েকটি গ্রাম নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে, ছোট হয়ে যাবে নকলার স্থল ভাগের মানচিত্র। এবিষয়ে ইউপি সদস্য রুকনুজ্জামান খান টুটুল বলেন, ২০১৫ সাল কি ২০১৬ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে ভাঙনের চিত্র সরজমিনে দেখে, ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে মর্মে এলাকাবাসীদের আশ্বাস দিয়ে ছিলেন; কিন্তু আজও কোন প্রকার পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা আজ হতাশ। তবে জনস্বার্থে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মান করা জরুরী বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয় সমাজ সেবক কামরুল ইসলাম গেন্দু বলেন, ব্রহ্মপুত্রের শাখা মৃগী নদীর ভাঙন রোধে এখনই দ্রুত পরিকল্পনা হাতে নিয়ে বাস্তবায়ন না করলে নদীর উত্তর তীরের আশপাশের এলাকাসহ সবজি ভান্ডার খ্যাত চন্দ্রকোনা বাজার হুমকির মুখে পড়বে। অব্যাহত ভাঙনে নকলা উপজেলার স্থলভাগের মানচিত্র আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে যেতে পারে বলে অশঙ্কা করছেন স্থানীয়রাসহ সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দরা।

চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাজু সাঈদ সিদ্দিকী জানান, এরই মধ্যে নকলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদুর রহমান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকে ব্রহ্মপুত্রের শাখা মৃগী নদীর ভাঙন পরিদর্শন করেছেন। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। তানাহলে মৃগীর নদীর ক্রমাগত ভাঙনের ফলে হুমকির মুখে পড়তে পারে উপজেলার একমাত্র শতবর্ষী মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চন্দ্রকোনা রাজলহ্মী উচ্চ বিদ্যালয় ও চন্দ্রকোনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা ও ফসলি জমিসহ রাস্তাঘাট। টানা বর্ষণে ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারনে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বেড়ে গেলে এ নদের শাখা মৃগী নদীর উত্তর তীর ভাঙনের তীব্র আকার ধারন করতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের শেরপুর জেলার উপপরিচালক দেলোয়ার হোসেন জানান, এবছর চর অষ্টধর ইউনিয়নের নারায়নখোলা এলাকায় ভাঙন রোধে নদীর তীরে ৫০০ মিটার এলাকায় বালির জিও ব্যাগ ফেলার পরিকল্পনা এরই মধ্যে হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে সাথে সাথেই কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি জানান। তাছাড়া গত বছর চন্দ্রকোনা এলাকায় নদীর ভাঙন রোধে বালির জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছিলো বলেও তিনি জানান। তাই চলতি বছর এ এলাকার ভাঙন রোধে এখন পর্যন্ত নতুন কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। তবে মৃগী নদীর ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বালির জিও ব্যাগ প্রয়োগ করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

নকলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদুর রহমান বলেন, নদী ভাঙনের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন। তবুও জনস্বার্থে ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা মৃগী নদীর ভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি লেনদেনসহ প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে দফায় দফায় চিঠি লেনদেন ও আলোচনা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর মৃগী নদীর ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।