ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা চার শিশু কুয়াকাটায় উদ্ধার

প্রকাশিত: ৫:০৭ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০
0Shares

এম.নাজিম উদ্দিন,পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা চার কিশোর কিশোরী তিনদিন পর কুয়াকাটায় উদ্ধার। বৃহস্পতিবার রাতে সমুদ্র সৈকতে টহলরত পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।
শুক্রবার বিকালে মহিপুর থানা প্রাঙ্গনে তাঁদের অভিভাবকদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। উদ্ধার হওয়া শিশুরা হলো সুমাইয়া (১৩), তাসিব হোসেন(১৪), ইয়াসিন(১৬)ও ইব্রাহিম(১৬)। করোনার কারণে গত কয়েক মাস ঘরবন্দী থেকে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।  বেশ কয়েক বছর আগে সুমাইয়ার মা ও বাবার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর সুমাইয়ার বাবা ও মা পুনরায় অন্যত্র বিয়ে করে নতুন করে সংসার পাতেন। মা-বাবা জীবিত থাকতেও ‘অনাথ’ সুমাইয়ার ঠাঁই হয় নানীর কাছে। নানী বয়স্ক মানুষ। এই নাতনিকে নিয়ে চলে যায় সংসার। সুমাইয়া ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে একটি মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে। সুমাইয়ার নানী অসুস্থ। মা-বাবাও কাছে নাই ওদিকে, মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত তাসিব। চাইলেই নিজেদের অবুঝ মনের চাওয়া-পাওয়ার কথাও কাউকে বলতে পারে না তারা। সুমাইয়া ও তাসিব একই মাদ্রাসার সহপাঠী। তাসিবের গল্পটাও অনেকটা সুমাইয়ার মতোই। কয়েক বছর আগে তাসিবের মা মারা গেছেন। এরপর বাবা আরেকটি বিয়ে করেছেন। এরপর থেকেই সৎ মায়ের সংসারেই বেড়ে উঠছে তাসিব।

পুলিশ জানায় করোনা আতংকে দীর্ঘদিন বাসায় গৃহবন্দী থাকার পর সবার অগোচরে বাসা থেকে বের হয়ে এই এ্যাডভেঞ্চারে বের হয় তারা।ওই সময়ে সমুদ্র সৈকতে মহিপুর থানা পুলিশের একটি দল টহল দিচ্ছিল। সেখানে চার শিশুর মোবাইল ও ট্যাব বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজতে দেখে পুলিশের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক লাগে। পুলিশের ওই দলটি তাদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে শুরুতে তারা কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। পুলিশ সদস্যগণ তাদের অভয় দিয়ে সৌহার্দপূর্ণ ও আন্তরিক আচরণ করায় তারা সাহস ফিরে পায়। সমস্যার কথা জেনে পুলিশ তাদের মহিপুর থানায় নিয়ে আসে। সারাদিন অভুক্ত থাকায় থানায় এনে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে পুলিশ। এরপর বিস্তারিত ঘটনা জেনে এবং তাদের থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচর থানার খবর দেওয়া হয়। মহিপুর থানার খবর পেয়ে ওই চার শিশুর পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে পুলিশ। এরপর তথ্য যাচাই-বাচাই করে ওই শিশুদের সঠিক অভিভাবক খুঁজে বের করা হয়। পুলিশের কাছে উদ্ধার হওয়া কিশোরী সুমাইয়া জানায়, সে ও তার প্রতিবেশী তাসিব ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকায় পরিবারের সাথে বসবাস করে। গত ২২ জুন সকাল ১০টার দিকে সুমাইয়া তার নানীর লকার থেকে টাকা নিয়ে তাসিবের সাথে বাসা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে রাতে সদরঘাট আসে।

সেখান থেকে রাত ১১টায় শরীয়তপুরগামী লঞ্চে ওঠে। রাতের বেলা যাত্রীরা যে যার স্থানে ঘুমিয়ে পড়লেন। কিন্তু তাদের দুজনের জায়গা নেই। কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে তারা লঞ্চের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি কররে লাগল। এমন অবস্থা দেখে ইয়াসিন (১৬) ও ইব্রাহিম (১৬) নামের লঞ্চের অপর দুই যাত্রী তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে। তখন নিজেদের সমস্যার কথা খুলে বলে তারা। ইয়াসিন ও ইব্রাহিমের কাছ থেকে তারা জানতে পারে, বর্তমানে শরীয়তপুরগামী লঞ্চে আছে তারা। এই লঞ্চ সকালে শরীয়তপুরের নড়িয়া গিয়ে থামবে। কথায় কথায় তাদের চারজনের মধ্যে বেশ ভাব হয়ে গেল। ইব্রাহিম ও ইয়াসিন তাদের জানায়, তাদের বাসা ঢাকার কেরানীগঞ্জ। তাদের মামা বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া থানায়। সকালে নড়িয়া পৌঁছে আবার বিকেলে লঞ্চে করে ঢাকায় ফিরে আসবে তারা।

সকালে তারা চারজন নড়িয়ার পৌঁছে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে কাটিয়ে দেয়। এরপর ২৩ জুন বিকেলের দিকে তারা নড়িয়া থেকে ঢাকাগামী লঞ্চে ওঠে। রাত আটটায় লঞ্চ এসে সদরঘাটে থামে। কিন্তু এই পুরো সময়টা তাদের খুব ভালো কেটেছে। শহরের বদ্ধ পরিবেশের বাইরে এমন স্নিগ্ধ পরিবেশ তাদেরকে মুগ্ধ করেছে। এদিকে, সুমাইয়ার কাছে আরও হাজার পাঁচেক টাকা আছে। তাই কুয়াকাটা ঘুরে দেখার ইচ্ছায় তারা বরিশালগামী একটি লঞ্চে উঠে পড়ে। পরের অর্থাৎ ২৪ তারিখ সকালে তারা বরিশাল পৌঁছায়। লঞ্চ থেকে নেমে বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে কুয়াকাটা পৌঁছায় তারা। দিনভর কুয়াকাটায় ঘুরে বেড়ানোর পর রাতে তারা হোটেল হানিমুনে রাত্রিযাপন করে। পরদিন ২৫ জুন সকালে সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে বের হয়ে টাকা শেষ হয়ে গেলে সারা দিন না খেয়ে কাটায়। বাধ্য হয়ে তারা সঙ্গে থাকা মোবাইল ও ট্যাব বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় পুলিশের হাতে তারা উদ্ধার হয়।
মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, রাতেই উদ্ধার হওয়া কিশোর-কিশোরীদের পরিবারের সাথে কথা বলে তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার খবর জানতে পারেন এবং তাঁদের নিয়ে যেতে মহিপুরে আসতে বলেন। শুক্রবার বিকালে তাদের অভিভাবকরা মহিপুর থানায় এলে কিশোর-কিশোরীদের পুলিশের পক্ষ থেকে ফুলের শুভেচ্ছা জানিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।  পুলিশের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিরাপদে সন্তানদের ফেরত পেয়ে অভিভাবকেরা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। সন্তানদের পুনরায় তাদের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপণ করেন।