আতঙ্ক কাটেনি তবু জাগতে হবে

প্রকাশিত: ৬:২৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০
0Shares

সুজলা সুফলা সুন্দর পৃথিবী। এখনও চার দিকে আতঙ্ক! এখনও স্থবিরতা ও অশান্তভাব কেটে যায়নি। চার দিকে এখনও ঘুমটবাঁধা অন্ধকার। বলা যাচ্ছে না যে, কখন পুরোপুরিভাবে থামবে এই আতঙ্ক। কখন ফিরে আসবে শান্তি। ধরণীকুলের মানুষ অন্ধকারের কালোছায়ায় আর ঘরে বসে থাকতে চায় না। মানুষ চায় হাঁটতে চলতে এবং যার যার কর্মস্থলে ফিরে যেতে। অলসভাবে আর ঘরে বসে থাকা যাবে না। মানুষকে আবার জেগে উঠতে হবে।

যদিও পৃথিবীর মহা আতঙ্কজনক মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের প্রকোপ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। যে ভাইরাসটি বিপজ্জনকভাবে তদ্রু সংক্রমণের মাধ্যমে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল। মানবকুলের ভয়জড়িত জীবনকে ভীতিকর ও আতঙ্কময় করে তুলেছে! সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রপুঞ্জে বয়ে যাচ্ছে অনাকাক্সিক্ষত আতঙ্ক! কিভাবে এই রোগের নিরাময় হবে। এই ভাইরাস থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়েও পৃথিবীর বড় বড় চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা গবেষণারত : উৎকণ্ঠিত। কিন্তু এখনও কোন কূল-কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না! চার দিকে এখনও আতঙ্ক ও মৃত্যুর বিভীষিকার খবর আসছে।

নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিকসংখ্যক লোকের প্রাণহানি ঘটেছে, যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে নিউইয়র্কে এই অদৃশ্য শত্রুর প্রকোপ কমে আসছে। গবেষকগণ বলছেন যে, এই বছরের মধ্যে করোনাভাইরাসের আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্রে আরও লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। যদিও নিউইয়র্কসহ অন্যান্য স্থানের লকডাউন তুলে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আতঙ্ক কাটেনি। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে উঠবার জন্য এবং জনজীবনের স্বস্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে লকডাউনটিও একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়।

ইতিহাসে মানবজাতির আবির্ভাবের সাথে রোগ-বালাইসহ অনেক ধরনের ভাইরাসের (মহামারীর) আসার দৃষ্টান্ত আছে। যুগে যুগে শতাব্দীকালে অনেক বড় ধরনের মহামারী মরণব্যাধি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। কিন্তু এবারের করোনাভাইসারটির সংক্রমণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অন্য রকম। আগেকার মারণব্যাধি ভাইরাসের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। আগে মহামারী কিংবা ভয়বাহ ভাইরাসগুলোর প্রকোপ ছিল কোনো নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী কিংবা দেশভিত্তিক। একটি অঞ্চলে কিংবা কোনো দেশ আক্রান্ত হলেও অন্য দেশ এবং অনেক স্থানে খুব একটা ছড়াত না। তার প্রতিষেধকের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এই করোনাভাইরাসটির সংক্রমণক্ষমতা এতই ভয়ানক ও তীব্র যা মাত্র তিন মাসের মধ্যে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে গ্যাছে। শহর-বন্দর,আকাশ, পথ নৌযান এমনটি সুকঠিন সুরক্ষিত রাজপ্রাসাদের এই ভাইরাসটি আঘাত করে বসেছে। কতিপয় নিয়ম ও ফর্মুলার বাইরে এই ভাইরাস প্রতিরোধের এখনও কোনো ভ্যাক্সিন ও ওষুধ বের হয়নি। ফলে, প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ অকালে মৃত্যুরকোলে ঢলে পড়ছে। অদৃশ্য মরণব্যাধির ছোবলে পৃথিবীময় আজ মৃত্যুর বিভীষিকা, শোকার্ত মানুষ ও স্বজনহারার আর্তনাদ।

করোনাভাইরাসের মতো সর্বব্যাপী মরণব্যাধি থেকে মুক্তি ও নিরাময়ের পথ কি তা নিয়ে গবেষণা চলছে। পৃথিবীতে আগে গুটিবসন্ত, ইবোলা, স্পেনিশ ফ্লু ও জলাতঙ্ক ভাইরাসের মতো অনেক রকম ভাইরাসের ওষুধ বের হয়েছিল। দ্রুত একটা রফা করা গিয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের কোনো নিরাময় ওষুধ বের করা সম্ভব হয়নি। এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার কিছু আপাত : ফর্মুলা ব্যতীত এখন পর্যন্ত সংক্রমিত রোগীকে রক্ষা করবার কোনো কার্যকর চিকিৎসাব্যবস্থা বের হয়নি। চোখ, নাক, মুখ, হাত, হ্যান্ডশ্যাক না করা এবং অন্য জনের নিকট থেকে দূরত্ব (সামাজিক দূরত্ব) বজায় রাখা ইত্যাদি নিয়মগুলো মেনে চললে ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সবার প্রত্যাশা যে, যত তাড়াতাড়ি ভাইরাসটির গতি-পরিণতি উদঘাটন করা যাবে এবং নিরাময়ের পথ বের হবে। পৃথিবীর মানুষের জন্য তা হবে মঙ্গলজনক।

এই সময়ের মধ্যে কী পরিমাণ লোকের ক্ষতি হয়ে যাবে তা আমরা কেউ জানি না। ইতোমধ্যে সমগ্র পৃথিবীতে অনেক মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে যাচ্ছে। আপাতত নিয়তির উপর মানুষের ভাগ্য ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে- জ্বর, সর্দি-কাশি, অবসাদ, শুষ্ক কাশি, শ্বাসকষ্ট, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, পেটব্যথা ও বমি ইত্যাদি। উপরোক্ত উপসর্গ থাকলেও কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে ভিন্ন কোনো উপসর্গও যোগ দিতে পারে।

করোনাভাইরাসের পোশাকি নাম কোভিড-১৯। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভয়ংকর ভাইরাসটি কিভাবে পৃথিবীতে এলো। ২০১৯ এর ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে চীনের রোহান শহরে করোনাভাইরাসের একটি সংক্রমণ দেখা দেয়। আস্তে আস্তে সমগ্র চীনে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব পুরো রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর পর্যায়ক্রমে তিন মাসের মধ্যে সমগ্র বিশ্বে করোনাভাইরাসটি ছড়িয়ে যায়। ভাইরাসটি উৎপত্তি নিয়ে অনেকের মাঝে দ্বিমত রয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুপাতে প্রথমে ১৯৬০ সালের দিকে মুরগি থেকে এলেও বর্তমানে এটি এসেছে এক ধরনের সাপের কাছ থেকে। চীনের মানুষ সাপসহ এমন আকৃতির নানা ধরনের প্রাণী খায়। অনেকের ধারণা সেখান থেকেই তার উৎপত্তি। কিন্তু কথা হলো কেন চীনের একটি মাত্র শহর থেকে বর্তমানে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে সমগ্র মানবতাকে গ্রাস করতে সক্ষম হলো? ইহা কি শুধু রোগ নাকি আকাশ থেকে নেমে আসা প্রকৃতির কোনো ধ্বংসলীলা! তা নিয়েও রয়েছে নানাবিধ প্রশ্ন ।

হাজার হাজার বছর থেকে এ রকম মহামারী ও রোগ কোনো একটা দেশ কিংবা অঞ্চলভেদে সংঘটিত হতো। অতিমাত্রিক পাশবিকতা, গোয়ার্তুমি, বাড়াবাড়ি ও সীমা লংঘনের ফলে যুগে যুগে মানুষকে শাস্তিস্বরূপ সৃষ্টিকর্তা প্রকৃতিক দুর্যোগ রোগ-বালাই ও মহামারী দিয়ে সঠিকপথে ফিরে আসার শিক্ষা দেয়ার ইতিহাস আছে। ধর্মানুরাগী মানুষ তা বিশ্বাস করেন। কোনো কোনো ধর্মের লোক ইহাকে অভিশাপ কিংবা গজব হিসেবে প্রচার করলেও সেইসব কথার কোনো ভিত্তি অথবা যুক্তি নেই। তবুও কেউ কেউ তাদের সেইসব বিশ্বাসবোধ জোর করে অন্যের উপর চাপানোর চেষ্টা করে থাকেন। ধর্মে যাদের বিশ্বাস নেই তারা অবশ্য সেটি মানতে রাজি নন। আসলে কোনটাই হয়ত ঠিক নয় এবং তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা অনুচিত। মানুষের বেড়ে উঠবার সঙ্গে সমানতালে রোগ-ব্যাধি ছিল এবং থাকবে- সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সর্বদিক থেকে সতর্কতা অবলম্বন করে রোগযুক্ত থাকার যেসব নিয়ম রয়েছে, তা মানতে হবে। জীবন পরিচালনের শৃঙ্খলাবোধ এবং সুস্থ থাকার নিয়মগুলো যথাযথ : মেনে চলার মধ্যে যে স্বস্তি ও শান্তি আছে তার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

মানুষ সৃষ্টির সেরা। মনুষ্যত্ব আর মানবতাবোধের শ্রেষ্ঠতম কাজের জন্যই মানুষ গৌরবান্বিত হয়, প্রশংসিত হয়। কিন্তু যেসব মানবদস্যু অবলীলায় শুধু মানুষকে নির্যাতন করে। কোনো ধরনের রোগ-ব্যাধি ছাড়াই যুদ্ধ-বিগ্রহে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রচুর লোক মর্মন্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্মের নামে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে, রাষ্ট্রক্ষমতা অবৈধভাবে কুক্ষিগত করার মধ্যদিয়ে, দেশ দখলের নামে, জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণবাদী হামলা, অত্যাচার নিপীড়ন ও সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে প্রতি বছর নারী ও শিশুসহ যে পরিমাণ নিরীহ মানুষকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। মানুষের বসবাসের সুন্দর পৃথিবীকে ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত করে। মানুষের রক্তের উপর দানবীয় রাজত্ব করে (!) তাদেরকে তো মানুষ বলা যায় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানববিধ্বংসী যুদ্ধ, বোমাবাজি ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিবেশ নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। প্রকৃতি বিষিয়ে উঠেছে। প্রকৃতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কারো মতে সেইসব দুষ্টাচারের বিরুদ্ধে পৃথিবী ও প্রকৃতির পক্ষ্য থেকে করোনাভাইরাস একটি চপেটাঘাত। এক ধরনের অভিশাপ।

আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে এক দিকে মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম অন্য দিকে অপর দিকে রক্তপিপাসু মানবদস্যুদের উন্মাদনা। যারা সাধারণ মানুষকে তাদের ভিটে-বাড়ি ও আবাস থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। অসহায় মানুষের সহায়-সম্বল কেড়ে নিয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। পৃথিবীতে এমন পাশবিকতা ও নিষ্ঠুরতা কমোগত বেড়েই চলছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উগ্রশাসকের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাও পৃথিবীকে হিংস্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি/নিত্য নিষ্ঠুর দ্বন্দ্ব, ঘোর কুটিল পন্থ তার/লোভ জটিল রন্ধ।’
বর্তমান বিশ্বে ভয়াবহ করোনাভাইরাসের আক্রমণে সবাইকে একঘরে বানিয়ে বসেছে। উগ্রবাদিরাও থমকে গেছে। এক কথায় সবাই এখন মহা আতঙ্কের মধ্যে নিপতিত।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান করোনাভাইরাসের উৎপত্তি নিয়েও ব্যাপক গবেষণা করবার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কেননা এই ভয়ংকর ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব ঘটেছে চীন থেকে। বর্তমান পৃথিবীতে চীন হচ্ছে একটি পরাশক্তি দেশ। বিশ্ব অর্থবিত্তে বর্তমান চীনের রয়েছে বিশাল প্রতিপত্তি। পৃথিবীর অনেক দেশ যুদ্ধ-বিগ্রহ ও হানাহানিতে লিপ্ত আছে। কিন্তু চীন সর্বদাই নিজের দেশের অর্থনৈতিক আধিপত্য বিশ্বময় ছড়াতে ব্যস্ত রয়েছে। নিজের দেশের জনগণের উপর হাজারোবৈষম্য, নিষ্পেষণ থাকার পরেও বর্তমানে চীন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ।

চীনের ইতিহাস অতি প্রাচীন। হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন রাজবংশ কর্তৃক শাসিত অনেকগুলো অঞ্চল নিয়ে চীনের রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস। হুয়াংহো ও ইয়াংজি নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা অনেকগুলো অঞ্চল এবং জোরপূর্বক অনেক রাজ্য-দেশ দখল ও কুক্ষিগত করে রাখা নিজস্ব প্রভাববলয়ে বর্তমানে চীন সাম্রাজ্য অনেক বিস্তৃত। চীনে নানা জাতি ও গোষ্ঠীর কোটি কোটি মানুষের বসবাস। এক সময় সেই দেশের অনেকাঞ্চল মুসলিম শাসনাধীনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কালক্রমে সেইসব অঞ্চলের সবগুলোই বর্তমান চীন সাম্রাজ্যের করায়ত্ত্ব। একসময় হুই মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও জিনজিয়ান প্রদেশে রাষ্ট্রপুঞ্জের দমন-নিপীড়নে শিকার হয়ে প্রতিবছর প্রচুর মুসলিমের প্রাণহানি ঘটে। এই রাজ্যের উইঘুর মুসলিম জনগোষ্ঠী এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ। বর্তমানে উইঘুর রাজ্যের প্রায় দের কোটি মুসলিম অনেক বছর ধরে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। তাদের উপর চীন সরকারের অমানবিক নিপীড়ন অব্যাহত আছে। এ ছাড়া নিংজিয়া, গানসু ও কিংহাই প্রদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম নানারকম দুঃখ-কষ্ট ও নিপীড়নের মধ্যে বসবাস করেন।

এই নিবন্ধে মুসলমানেদের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন এ জন্য যে, বিগত কয়েক শতক ধরে চীন সাম্রাজ্যে হাজারো জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলিম জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং হত্যাযজ্ঞের শিকার। ফলে চীনের অধিকাংশ রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা নেই বললেই চলে। চীন শুধু তার দেশের মুসলমানদের প্রতি অত্যাচার, নির্যাতন করে না। বাইরের কিছু দেশেও মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং অন্য ধর্মের মানুষের উপর নির্যাতন ও বিতারণের ব্যাপারে সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারি দেখিয়ে চীন একই আদলে মিয়ানমার মুসলিম নিধনে সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। মিয়ানমার আদি মুসলিম এলাকাগুলোকে জনশূন্য করে দিয়ে সেসব অঞ্চলে বার্মিজ মগদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে চীন সরকারের বিরাট সাহায্যের হাত সবসময়েই খোলা রয়েছে। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক করুণ অবস্থায় রয়েছে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী।

অনেক বছর ধরে মিয়ানমারের অমানিক নির্যাতনে আরাকান, রাখাইনসহ মিয়ানমার বিরাট অঞ্চলগুলো বিরাণ হয়ে গেছে। বর্তমানে উগ্রবাদী মগদের দখলে চলে গেছে। শত শত বছর ধরে বসবাসকারী মুসলিম রোহিঙ্গারা এখন মিয়ানমার থেকে বিতারিত। লক্ষ লক্ষ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে মিয়ানমার সরকার ওইসব এলাকাগুলোতে বার্মিজ মগদের পুনর্বাসিত করতে ব্যস্ত। জাতিসংঘসহ পৃথিবীর সকল দেশ মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করার পরও একমাত্র চীনের মদদে সেখানে অত্যাচার, নিপীড়ন অব্যহত রয়েছে। বর্তমানে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী মানবিক বিপর্যয়ের এক চরমতম অবস্থায় বাংলাদেশে করুণ জীবনযাপন করছে।

চীন সরকারের আরেকটি অমানবিক দিক হচ্ছে যে, নিজ দেশের নাগরিকদের ভেতর থেকে সদ্য জন্ম নেয়া অনেক বিকলাঙ্গ শিশুকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নির্দয়ভাবে হত্যা করার মতো কুসংস্কারটিও চীনে বিদ্যমান।
যাই হোক, ভয়ংকর করোনাভাইরাসটির উৎপত্তির কারণ আলোচনা ও গবেষণার বিষয়। চীনা কর্তৃপক্ষের কথামতো ভাইরাসটির জন্ম যেহেতু প্রাণী থেকে। তেমনই রুচি বিবর্জিত অনেক নিষিদ্ধ প্রাণীগুলো যেমন- সাপ, কেচো, বাদুর, শোকর, কুকুর, শৃগাল, বিড়ালসহ অনেক জাতের নানা রকমের রুচি বিবর্জিত প্রাণী চীনারা অবলীলায় ভক্ষণ করার ফলেই হয়ত এই ভয়াবহ করোনাভাইরাসের উদ্ভব ঘটতে পারে। এমনও প্রবাদ আছে চীনের কোনো কোনো অঞ্চলে মওকা মতো মানুষ পাইলে হত্যা করা হয় এবং তা ভক্ষণ করা হয়।

এমন অসভ্যপনা যে দেশে বিদ্যমান এবং যারা স্বার্থের ব্যাপারে ষোলআনাই বোঝে। তাদের আচার-ব্যবহারের কোনো নীতিমালা রুচিশীল নীতিমালা নেই। তারা কোনো ম্যানার মেনে চলে না। বহুদিনধরে চীন একটি অগণতান্ত্রিক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। সেই দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার লংঘিত হওয়ার বিষয়টির জনশ্রুতি আছে।

আরও একটি প্রশ্ন বিশ্বব্যাপী দানা উঠছে- যে শহরটিতে (রোহান) করোনাভাইরাসের উৎপত্তি তা এত দ্রুত কিভাবে তা নিয়ন্ত্রণে এসে গেল। এমনও জানা গেছে যে, সেখানে ভাইরাসে মারাত্মকভাবে আক্রান্তদেরকে লাশের সাথে পুড়িয়ে মারা হয়েছে এবং ধূলিসাৎ করে দেয়া হয়েছে। মানুষকে রক্ষা করার নামে এমন অদ্ভূত নির্দয় পদ্ধতিও চীনের ব্যাপারে শোনা যায়। অবাক ব্যাপার চীনের বিশাল সাম্রাজ্যের অন্য শহরগুলোতে ভাইরাসটি খুব একটা ছড়ায়নি। এখন মোটামুটি নিরাপদ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শহরের তুলনায় বেইজিং, হংকংসহ অনেক বড় বড় শহর কেমন করে নিরাপদ আছে। অথচ সারা বিশ্বের প্রতিটি দেশের বড় বড় শহরে দ্রুত ছড়িয়ে গেল! চীনা সরকারের পক্ষ থেকে যদি বিশ্বকে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে কঠোর সতকর্তা জারি করা হতো এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে সব রাষ্টের সাথে সাময়িকভাবে চীনের যোগাযোগ বিচ্ছন্ন করা হতো তাহলে অবশ্যই এতদ্রুত সমগ্র বিশ্বময় ভাইরাসটি এত ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়ত না। এইসব প্রশ্নের ধূম্রজালের একটা সদুত্তর ও সমাধান বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে প্রকাশ হওয়া উচিত।

চীনের একটি রাজ্য থেকে জন্ম নেয়া ভাইরাসটি মাত্র তিন মাসের মধ্যে সমগ্র বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলল। বিশ্বের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। সারাবিশ্বকে অচল হয়ে গেছে(?) সেইসব নিয়ে অবশ্যই গবেষণা দরকার এবং তার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা প্রয়োজন।
ভোগ-বিলাস, মানববিধ্বংস আর হিংসার রাজত্ব চালানোর উগ্র-উল্লাসে আরব, ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকদের উৎপীড়ন ও নিপীড়নে হৃদয় বিগলিত হয়। ক্ষমতা, রাষ্ট্রদখলসহ মানবেতিহাসের বর্বরতম হত্যাকাণ্ড সে দেশগুলোতে চালু হয়ে আছে।
মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম গুণের অন্যতম। মানুষের কল্যাণবোধ ও মঙ্গল কামনা তথা মানবসেবার মধ্য দিয়েই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সম্ভব। মানুষকে অগ্রাহ্য এবং মানববিধ্বংসের মধ্যদিয়ে কখনো শ্রেষ্ঠ হওয়া যায় না।
‘মানুষ’ কবিতায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানবতাবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-’’
মানুষেরে ঘৃণা করি

ও কারা কুরআন-বেদ-বাইবেল চুম্বিছে! মরি মরি!
ও মুখ হইতে গ্রন্থ-কেতাব নাও জোর করে কেড়ে
কাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে
পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! মূর্খেরা শোনো
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!”
দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন- ‘শ্রেষ্ঠ মানুষের মধ্যে তিনটি চিহ্ন থাকে- ধার্মিক হওয়ার দরুন দুঃচিন্তামুক্ত, জ্ঞানী হওয়ার দরুন, হতবুদ্ধিতা হতে মুক্ত এবং সাহসী হওয়ার ক্ষেত্রে ভয়মুক্ত’।

তবে ইহা সত্য যে, মানুষ পৃথিবীতে আছে এবং থাকবে। মানুষকে রক্ষাকল্পে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক ব্যবস্থাও অব্যাহত থাকবে। নতুন রোগের প্রাদুর্ভার যেমন ঘটবে তার নিরাময়েরও ব্যবস্থা ক্রমাগত আবিষ্কৃত হবে। মানুষ আছে, কেননা পৃথিবী আছে। মানুষ থাকবে, কেননা পৃথিবী থাকবে।
আমাদের প্রত্যাশা আর কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ নয়। আর কোনো ধ্বংস ও মানববিধ্বংস নয়; মানুষকে রক্ষা করাই হলো মানবতার শ্রেষ্ঠতম কাজ। মানুষই মানুষকে রক্ষা করতে পারে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ভয়ংকর করোনাভাইরাসের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধের ব্যাটালিয়নের মতো জীবনবাজি রেখে চিকিৎসকগণ কর্মরত। সেবা করতে গিয়ে অনেকে মার্মন্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করছেন। তাদের প্রতি আমাদের সম্মিলিত শ্রদ্ধা। মানবিক কার্যক্রম আছে বলেই এখনও পৃথিবী টিকে আছে। হিংসা-বিদ্বেষ এবং হিংসাবর্তী কার্যকলাপ থেকে নিজেদের মুক্ত রেখে আমরা যেন এই সুন্দর পৃথিবীর মানুষকে রক্ষাকল্পে সচেষ্ট থাকি। মানুষের স্বার্থে আমাদের সাহায্যের হাত প্রসারিত রাখার চেয়ে মহত্বম কাজ। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহপাক পৃথিবীর সকল মানুষকে রক্ষা করুন। আমরা যেন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। ‘সকলে মোরা সকলের তরে’ এই নীতিতে আমরা যেন সুন্দর পৃথিবীকে নির্মল করে শান্তিময় করে তোলার ব্যাপারে স্বচেষ্ট থাকি। আর কোন আতঙ্ক নয়। এখন জেগে উঠবার সময়। পৃথিবী আবার জেগে উঠুক।

আরিফুল ইসলাম (বার্তা সম্পাদক)
          “দ্যা নিউ স্টার”