পৃথিবীর মেরামত

প্রকাশিত: ৬:২৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০
0Shares

পৃথিবীটা কেমন জানি সেলফিশ হয়ে গিয়েছিল। কেউ কাউকে সহ্য করতে চায় না। কেউ কারো ভালো দেখতে পারে না। সবাই নিজেকে আলাদা করতে চায়। সবাই নিজেকে আলাদা রাখতে চায়। আগে সীমান্তে থাকতো কাঁটাতারের বেড়া, এখন দেশে দেশে মনের সীমান্তে ঘৃণার দেয়াল। কেউ বলে এই মাটি আমার। এই দেশ আমার। আমার দেশে থাকতে হলে আমার হয়ে থাকতে হবে। আমার বুলি বলতে হবে। কেউ বলে, আমার দেশে থাকতে হলে কাগজ দেখাও। প্রমাণ করো যে- এ দেশ তোমার ছিল। তুমি উড়ে এসে জুড়ে বসোনি।

কেউ বলে, আমাদের গায়ের রঙ সাদা। কালোরা আমাদের চেয়ে নিম্নবর্ণের! সুতরাং আমরাই সেরা। রাজ চলবে আমাদের। আমরা মানে সাদাদের। ‘সাদা মানেই শুভ্রতা, কালো হচ্ছে অকল্যাণের সাইন’- এ কনসেপ্টটি এত চমৎকারভাবে বাজারজাত করা হয়েছে যে, তামাম পৃথিবীর মানুষও এখন তাই ভাবে। শান্তির প্রতীক হিসেবে সাদা পায়রা উড়ানো হয়। শান্তির বৈঠকে ওড়ানো হয় সাদা পতাকা। কারণ, সাদা হচ্ছে শান্তির প্রতীক। বিষাদের দিনকে বলা হয় ব্ল্যাক ডে, অবৈধ টাকাকে বলা হচ্ছে ব্ল্যাক মানি। কারণ, কালো মানেই খারাপ। কালো মানেই অশুভ!
কেউ বলে, আমরা উন্নত। আমরা অত্যাধুনিক। আমরা উচ্চশিক্ষিত। বাকিরা সবাই মুর্খের দল। মুর্খরা আমাদের চেয়ে দূরে থাকুক। তথ্য-প্রযুক্তিতে আমরা আছি উন্নতির শিখরে। পৃথিবীটা আমাদের হাতের মুঠোয়। সুতরাং, বাকিরা আমাদের তোয়াজ করে চলবে। কেউ আমাদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারবে না। সহ্য করা হবে না।

২.
দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার আবহমানকাল থেকেই চলে আসছে। বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে দুর্বল দেশগুলোর উপর সবলদের আক্রমণে, নিপীড়িত মানুষের আহাজারিতে, অত্যাচারিতের কান্নায় বিষাদময় হয়ে গিয়েছিল আকাশটা। মানুষে মানুষে ভালবাসা থাকবে। মানুষ মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালবাসবে। মানুষের কষ্টে মানুষ কষ্ট পাবে। যে যার ধর্ম পালন করবে, যে যার আদর্শ লালন করবে, কিন্তু পৃথিবীটা থাকবে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। কেউ কারো পাশে দাঁড়াতে না পারি, অন্তত লাথি দিয়ে গর্তে ফেলতে চাইব না- এমনটাই হবার কথা। হলো ঠিক উল্টোটা। কে কাকে সাইজ করবে, কে কার গা থেকে কতো রক্ত ঝরাবে, শুরু হলো কমপিটিশন। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেকে নিয়ে। কেউ কারো সুখে-দুঃখে সাথী হতে চায় না। কেউ কাউকে আপন ভাবতে পারে না। সবাই চায় আলাদা থাকতে। সবাই চায় নিজেকে গুটিয়ে রাখতে।
প্রকৃতি বলল, তবে তাই হোক। তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হোক। থাকো আলাদা হয়ে! কেউ যখন কারো সাথে থাকতে চাও না, কেউ কাউকে সহ্য করতে চাও না, তাহলে থাকো যার যার ঘরে, দরজা বন্ধ করে। ঘর ঝাড়– দিয়ে সময় কাটাও। করোনা নামের অদৃশ্য ভাইরাসটি প্রবল প্রতাপে চষে বেড়াতে লাগল বিশ^ময়। মানুষকে বাধ্য করল ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে।

৩.
করোনা পৃথিবীকে যে ম্যাসেজ দিলো, সে ম্যাসেজটি কি আমরা রিড করতে পারছি? আমরা কি লক্ষ করেছি করোনা উঁচ-নিচ তফাৎ করেনি। করোনা জাতি-ধর্মে ফারাক করেনি। গায়ের রঙ দেখেনি। উপরতলা নিচেরতলা- কাউকেই ছাড় দিয়ে কথা বলেনি। পৃথিবীর মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে গরিব-দিনমজুর কাউকেই নিস্তার দেয়নি। করোনা কারো কাছে এসে জানতে চায়নি তোমার স্ট্যাটাস কী? জিজ্ঞেস করেনি তোমার ক্লাস কেমন? বুঝতে চায়নি কার সামাজিক অবস্থান কোথায়? রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী- কাউকেই ছেড়ে কথা বলেনি। করোনা জানিয়ে দিলো তোমরা মানুষে মানুষে ফারাক করতে চাইলে করো, আমি করলাম না। এখন তোমরা যেমন আছো তাই থাকবে, নাকি চরিত্রে পরিবর্তন আনবে, এটা তোমাদের ব্যাপার।

করোনা ম্যাসেজ দিলো, ঘরের একজন মানুষের অসতর্কতার কারণে ঘরে যদি আগুন লাগে, তাহলে সেই আগুনে সবাইকে পুড়ে মরতে হয়। যে আগুন লাগিয়েছিল, সেও। যারা লাগায়নি, তারাও। যারা জেগে ছিল তারাও, যারা ঘুমিয়ে ছিল, তারাও। করোনাও তাই ছিল। পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তের কিছু মানুষ যদি পাপ করে, আর বাকিরা থাকে পাপীর পেছনে, অথবা দর্শকের ভ‚মিকায়, তাহলে প্রকৃতি কাউকেই ছাড় দেয়া হয় না।
করোনা বিশ^বাসীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নেই। করোনা বুঝিয়ে দিয়ে গেল চামড়ার কালার বিশেষ কিছু মিন করে না। ইট ডাজেন্ট মেইক এনি সেন্স। করোনা সবাইকে এই ম্যাসেজ দিয়ে গেল যে, জোয়ার যখন আসে, কাঁচাঘর পাঁকাঘরের ফারাক করে না। ভেসে যায় সব। বেঁচে থাকে শুধু তারা, স্রষ্টা যাদের বাঁচাতে চান।
আতঙ্কে থমকে দাঁড়িয়েছে পৃথিবী। মৃত্যু ভয়ে চুপসে আছে সবাই। কেউ মরতে চায় না; যদিও জানে মৃত্যু অবধারিত। কেউ পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায় না; যদিও জানে যেতে হবে সবাইকেই। কঠিন একটা সময় পার করছে গোটা বিশ^। কেউ নিরাপদ নেই। কেউ স্বস্তিতে নেই। সবার চোখেমুখে আতংক। কী হচ্ছে, কাল কী হতে যাচ্ছে, ঘুম থেকে উঠার পর কতজনের মৃত্যুর খবর শুনতে হবে- কেউ জানে না!

৪.
একদিন হয়তো থেমে যাবে ঝড়, সুস্থ হবে ধরা, জেগে উঠবে বসুন্ধরা। আবারও ঝালাপালা হবে পৃথিবীর কান, রক্তের অণু- চিৎকারে! আবারও কেঁপে ওঠবে আকাশÑ দুর্বলের কান্নায়! তখন যদি, আবারও যদি রেগে যায় প্রকৃতি, ধেয়ে আসে নতুন কোনো অশরীরী।
সহ্যের সীমাতো অনেক আগেই ডিঙিয়েছি; আমরা যারা মহাশক্তিধর। শক্তির পরীক্ষাতো হলোই। তাকাতে হলো আকাশের দিকে। এই অসহায়ত্বের কথা কি মনে থাকবে; আবারও কোনো অসহায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে।
বিশ্বাসের বলয়টা কি তৈরি হবে এবার?
হওয়ার তো কথা। যদি না-ও হয়,
বৈচিত্র্যের মাঝেও যেন বাজে-
ঐক্যের সুর।

আরিফুল ইসলাম (বার্তা সম্পাদক)
         “দ্যা নিউ স্টার”