করোনা-মন্দা-ডেঙ্গু-বন্যা চতুর্মুখী সংকটে বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ৬:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০
0Shares

বৈশ্বিক মহামারি করোনায় থমকে গেছে পুরো বাংলাদেশ। অদৃশ্য এক ভাইরাসের সঙ্গে গত মার্চ মাস থেকে যুদ্ধ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে দেশ। কিন্তু কোনোভাবেই পেরে ওঠা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। মানুষ চিকিৎসার জন্য ঘুরছে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। মৌলিক অধিকার চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে পথেঘাটে। করোনার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতেও।

করোনার ধাক্কায় শিল্প-কারখানা, গার্মেন্টস, সংবাদপত্র, ব্যবসাসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলছে গণছাঁটাই। চাকরি হারিয়ে বেকার হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। ফলে দিন দিন বাড়ছে বেকারত্ব, সংকুচিত হচ্ছে কাজের সুযোগ। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিদেশ থেকে চাকরি হরিয়ে দেশে ফিরেছেন অনেক মানুষ। আবার অনেকেই চাকরি হারিয়ে বেকার বসে আছেন। ফলে কমে এসেছে রেমিট্যান্স প্রবাহও। করোনার এই সংকটের মাঝে বন্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো। লোকসানের বোঝা আর বইতে চাইছে না সরকার। তাই স্থায়ী ও অস্থায়ী অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিককেই স্বেচ্ছা অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস বলছে, দেশে করোনার প্রকোপে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। আর করোনোর আগে যারা দরিদ্র ছিল, তাদের অবস্থা একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নিদারুণ অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছে অনেক মানুষ। সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার কারণে করোনা-পরিস্থিতি প্রকট হয়েছে বলে দাবি করছেন সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

এদিকে দেশের মানুষ যখন করোনার ভয়ে সন্ত্রস্ত, ঠিক সে সময় নতুন বিপদ হয়ে হানা দিয়েছে বন্যা। একই সঙ্গে উঁকি দিচ্ছে আরেক মহামারি ডেঙ্গুর শঙ্কাও। সব মিলিয়ে করোনা, অর্থনৈতিক মন্দা, ডেঙ্গু আর বন্যা-এই চতুর্মুখী সংকটে পড়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো খারাপ হবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, দীর্ঘ বেকারত্বের কারণে জমানো সঞ্চয়ও শেষ হয়ে গেছে অনেক। করোনার কারণে বাসা ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে রাজধানী ছেড়েছেন অনেকে। পর্যায়ক্রমে দেশে দারিদ্র্যের সংখ্যা আরো বাড়বে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) বলছে, করোনার আগে মোট বেকার ছিল ১৭ শতাংশ। করোনার কারণে নতুন করে ১৩ শতাংশ মানুষ বেকার হয়েছে। ফলে বেকার মানুষের সংখ্যা এখন ৩০ শতাংশ। সেসব পরিবারের সদস্যদের চাকরি আছে এবং একজন সদস্যের মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার নিচে, সেই পরিবারের আয় কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে একজন সদস্যের আয় ১৫ হাজার টাকার নিচে, এমন পরিবারের আয় কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। এছাড়া একজন সদস্যের আয় ৩০ হাজার টাকার নিচে, এমন পরিবারের আয় কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
জরিপটি বলছে, চলতি বছরের শুরুতে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৩ শতাংশ। করোনার প্রকোপে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। বছরের তৃতীয় ও শেষ প্রান্তিকে মানুষের আয়ের কাক্সিক্ষত হার যদি ফিরে আসে, তাহলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। তার পরও বছর শেষে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ ছাড়াতে পারে।

বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষণা ফেলো বিনায়ক সেন জানান, করোনা সংকটের প্রভাব কাটাতে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ লকডাউন অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। লকডাউনে যেমন দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, অন্যদিকে কোভিডের আগেই যারা দরিদ্র ছিলেন, তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার দারিদ্র্য হ্রাসের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি কোভিডের সময়ে শহরের শ্রমিকের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ এবং গ্রামীণ শ্রমিকের আয় কমেছে ১০ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে সমাজ বিশ্লেষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এটা একটা জরুরি অবস্থা। একে দুর্যোগ হিসেবে দেখতে হবে। এখন জিডিপি কত পার্সেন্ট উন্নত হলো, তা দেখার বিষয় নয়। বর্তমানে বিবেচনার বিষয় হলো মানুষকে বাঁচানো। আর মানুষ বাঁচানোর একমাত্র উপায় হলো ত্রাণ দেওয়া। দেশের বেকার শ্রমিকদের ব্যাপক হারে এবং যথার্থ স্থানে ত্রাণ দিতে হবে। এখন জিডিপির বড়াই করলে ত্রাণদাতারা ত্রাণ দেবে না। এটা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়। করোনা পরিস্থিতির উত্তরণ হলে দেখা যাবে কীভাবে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়।

বন্যার পদধ্বনি : করোনার এই সংকটময় সময়ে নতুন বিপদ হয়ে হানা দিয়েছে বন্যা। গত কয়েক দিনে দেশে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। কোনো কোনো নদ-নদীর পানির উচ্চতা কমলেও ভয়াবহভাবে বাড়ছে নদী-তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন। কয়েক জেলায় নতুন করে বন্যার পানি না উঠলেও পানিবন্দী থাকা মানুষের দুর্ভোগ কোনোভাবেই কমেনি। এ পর্যন্ত বন্যার বিস্তৃতি ঘটেছে ১২ জেলায়। এর মধ্যে রয়েছে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুমিল্লা। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে একের পর এক রাস্তাঘাট-জনপদ ডুবে মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতে ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি। এখন নিজেদের আর গবাদিপশুর ঠাঁই নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় দুর্গতরা।

ডেঙ্গুর শঙ্কা : ২০১৯ সালে দেশে রেকর্ড সংখ্যক ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। গত বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হলেও চতুর্থ মাস থেকে ধীরে ধীরে সেটি কমে এসেছে। আর এখন চলছে করোনা মহামারির প্রকোপ। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, করোনার প্রকোপের কারণে ডেঙ্গু হয়তো চাপা পড়ে যাচ্ছে। মানুষ আতঙ্কে রয়েছে, জ্বর হলে বাসায় থাকছে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না। হয় কোভিড, নয়তো নন-কোভিড হিসেবে তাদের চিকিৎসা চলছে। উপেক্ষিত থাকছে ডেঙ্গু। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩২২ জন।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৩১৮ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি বলে জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। গত বছর ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর পাশাপাশি ডেঙ্গুতে ১৭৯ জনের মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করে আইইডিসিআর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের হিসাব থেকে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১৯৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ জন, মার্চে ২৭ জন, এপ্রিলে ২৫ জন, মে মাসে ১০ জন এবং চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ১৬ জন। গত বছরের হিসাব থেকে দেখা যায়, জানুয়ারিতে রোগী ভর্তি ছিলেন ৩৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৮ জন, মার্চে ১৭ জন, এপ্রিলে ৫৮ জন, মে মাসে ১৯৩ জন এবং জুন মাসে ১ হাজার ৮৮৪ জন।

আরিফুল ইসলাম (বার্তা সম্পাদক)
          “দ্যা নিউ স্টার”