বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হরিলুটের অভয়ারণ্য !

প্রকাশিত: ৬:৪৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০
0Shares

প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে কয়েক লাখ মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন। এমনকি দেশে যারা ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকেরই চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় ছুটে যাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। মোটামুটি সামর্থ্যবানরাও দেশে চিকিৎসা নিতে চান না।
করোনার কারণে হঠাৎ করে সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় এখন ভোগান্তিতে পড়েছে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ। যারা একসময় উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুরে যাতায়াত করেন, তাদেরও এখন লাইন ধরতে হচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে।

তবে ব্যক্তিগত টাকা খরচ করে বিদেশে চিকিৎসা নিলে সেটি নিয়ে তেমন কোনো আপত্তি ওঠে না, কিন্তু রাষ্ট্রের টাকায় অর্থাৎ জনগণের করের টাকায় বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেক সময়ই প্রশ্ন ওঠে। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিত্তবানদের অনেকেই দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও চিকিৎসকের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। দেশে চিকিৎসা নেওয়া যায় এমন অসুখেও বিদেশ চলে যান তারা। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তারাও চিকিৎসা নিতে ছুটে যান বিদেশে। সব মিলে প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা কয়েক লাখেরও বেশি। এমনকি মধ্য আয়ের মানুষজনও দেশের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিবেশী দেশে চিকিৎসা নিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিশেষ করে, আলোচনায় আছে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জ্বর-সর্দি হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে ছুটে যেতেন।

কিন্তু বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন শুরু হয় প্রতিটি দেশে। যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় এক দেশ থেকে অন্য দেশের। লকডাউন শুরু হওয়ার পর এই বিদেশমুখীা চিকিৎসাপ্রত্যাশী সবাই সংকটের মধ্যে পড়ে গেছেন। দেশের রাজনৈতিক নেতা, আমলা, এমপি, মন্ত্রীসহ সবাই বিদেশমুখী চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল থাকায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হয়েছে হরিলুটের অভয়ারণ্য। ঘটছে দুর্নীতি আর ‘পর্দা কেলেঙ্কারি’র ঘটনা। অনেক ঘটনা সামনে এলেও নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর কোনো ব্যবস্থা।

এছাড়া দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি থাকায় বিদেশমুখী হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনায় নাজেহাল দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। তবে ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস কোভিড-১৯-এর কারণে নজর পড়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোর দিকে। করোনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাত কীভাবে ‘আইসিইউতে’ রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের এমন নাজেহাল অবস্থার জন্য দুর্নীতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। মহামারি করোনাভাইরাসের আগে দেশের মোট চিকিৎসাসেবার প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে দেওয়া হয়। এখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর পুরো চাপটা এসে পড়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে। সরকারি চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর একধরনের আস্থাহীনতা এবং বেসরকারি হাসপাতালের অধিক খরচের কারণে বিদেশমুখী চিকিৎসার ওপর মানুষের আস্থা বেশি বলে মনে করছেন বিজ্ঞজনেরা।

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া রোগীদের বেশির ভাগই ভারতে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১৫ লাখ বাংলাদেশিকে ভারতের ভিসা দেওয়া হয়েছে। এদের বড় একটি অংশ চিকিৎসার জন্য দেশটিতে ভ্রমণ করেছেন। অনেকে যেমন চিকিৎসা ভিসায় ভারতে গেছেন, কেউ কেউ আবার পর্যটক ভিসায় ভারতে গিয়ে চিকিৎসা-সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক হাসপাতাল, চিকিৎসক থাকার পরও কেন তারা বাংলাদেশে চিকিৎসা না নিয়ে ভারতের ওপর এতটা নির্ভর করছেন?

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্যয় কম হওয়ায় রোগীরা ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের ওপর রোগীদের আস্থার ঘাটতি ও একেক হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একই পরীক্ষার একাধিক ফলাফলের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সরকারি চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর মানুষের একধরনের আস্থাহীনতা থেকে এমন প্রবণতা শুরু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

আরিফুল ইসলাম (বার্তা সম্পাদক)
        “দ্যা নিউ স্টার”