ব্যবসায়ী-সরকার স্নায়ুদ্বন্দ্ব

প্রকাশিত: ৬:১৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০
0Shares

চলমান করোনা মহামারির কঠিন সময়ে সরকারের সঙ্গে অনাকাক্সিক্ষত স্নায়ুদ্বন্দ্ব বেধেছে বিজনেস কমিউনিটির। তা সরকারের প্রণোদনা, বিশেষ সহায়তা, নানা রকম সুবিধা পাওয়ার পরও। বড়দের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন প্রণোদনা বা সহায়তা না পাওয়া তুলনামূলক ছোট ব্যবসায়ীরাও। ছোট-বড় বিজনেস কমিউনিটি একযোগে ক্ষিপ্ত সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপে। বিশেষ করে ব্যাংকিং কার্যক্রমে। সুবিধাভোগীরা উল্টো ব্যাংককে দূষছেন। সরকারের প্রণোদনার সব দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর ওপর দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা ব্যাংকগুলোর আছে কি না, এ প্রশ্ন তুলেছেন তারা। সুবিধা না পাওয়া ব্যবসায়ীরা খেপেছেন বঞ্চনার জেরে। দুই ক্ষোভ আবার একসঙ্গে
হয়েছে করোনার ঝড়ের তালগোলে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে রিজার্ভের টাকা ব্যবহারের উদ্যোগে শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। এতে তারা বঞ্চিত হবেন বলে ভাবছেন। তাদের শঙ্কা আবারও ঋণের সুদহার বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে ব্যাংকগুলো। আসলে ব্যাংকগুলো এখন ডাবল ডিজিট বা দুই অঙ্কে ঋণের সুদ নিতে চায়। কিন্তু ৯ শতাংশ সুদে প্রণোদনা বাস্তবায়ন করতে ঋণ দিতে চায় না ব্যাংক।

ব্যাংক, অর্থ ব্যবস্থাপনাসহ কিছু বিষয়ে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তে বিজনেস কমিউনিটির ছোড়া অভিযোগ সরকারের বুকেই বিঁধছে। ব্যবসা করতে সরকারি দফতরে পদে পদে হয়রানি আর ভোগান্তির অভিযোগ পুরোনো হলেও তা নতুন করে চালাচালি হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ প্রশ্নে সরকারের ঘন ঘন নীতি-কৌশল বদলেও বিরক্ত ব্যবসায়ীরা। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে রিজার্ভের টাকা ব্যবহারের উদ্যোগে শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। এতে তারা বঞ্চিত হবেন বলে ভাবছেন। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে রিজার্ভের টাকা ব্যবহারের আলোচনা আগেও হয়েছিল। এখন আবার এল সামনে।

আলোচনাটা টেনে এনেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক। এর সভায় রিজার্ভের টাকা উন্নয়ন প্রকল্পে খরচের বিষয়টি তুলেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একনেক সভায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালে যোগ দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দেশের ৩৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কম কথা নয়। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ না নিয়ে এই টাকা ব্যবহারের চিন্তাভাবনাও প্রাসঙ্গিক। অর্থনীতি সম্পর্কে ওযাকিবহালরা বলছেন, তিন মাসের আমদানি ব্যয় জমা থাকা স্বস্তিদায়ক। তা দিয়ে প্রায় এক বছরের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে ব্যয় করার ভাবনাটি সামনে আনা হয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত ধারণার পর্যায়ে হলেও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা সিদ্ধান্ত বা নির্দেশের চেয়ে কমও নয়। ব্যক্তিগত মত হিসেবে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, রিজার্ভের টাকা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা যায়। তার ভাষায় : আমরা আমাদের নিজেদের টাকা নিজেরাই ব্যবহার করব, বাম হাতের টাকা ডান হাত ঋণ নেবে। এতে কোনো সমস্যা দেখছেন না তিনি।

করোনার আগে থেকেই বেসরকারি খাতে ঋণে ধীরগতি ভর করেছে। করোনার পর থেকে এই গতি আরো মন্থর। এমনকি করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণেও তেমন গতি নেই। এতে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ তলানিতে নেমে গেছে। পুরো অর্থবছরে ১৪.৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মে পর্যন্ত বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮.৮৬ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংকপাড়া অস্থির আরো আগে থেকেই। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতিও বাড়ছে। নয়-ছয়, সাত-পাঁচ বোঝানোর মাত্রাও বেড়েছে। প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণ বাড়লেও নানা উপায়ে তা কম দেখানো হচ্ছে। প্রকৃত বিচারে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে মূলধন পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে।

প্রচুর ঋণ পুনঃ তফসিল, ঋণ শ্রেণিকরণের শর্ত শিথিলসহ নানা উপায়ে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমানো হলেও ব্যাংকে বাড়ছে মূলধন ঘাটতি। গত মার্চ প্রান্তিকে ১৩টি ব্যাংক প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে। প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে সরকারি সাতটি ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে ১২টি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি ছিল ২২ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে জানুয়ারি থেকে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেউ কিস্তি না দিলেও তাকে খেলাপি দেখানো যাবে না। তবে শুধু যেটুকু প্রকৃত আদায় হচ্ছে তার বাইরে বাকি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে আগের নিয়মেই শ্রেণিকৃত ঋণ হিসেবেই প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। এর পরিণতিতে মূলধনে ঘাটতি বাড়ছে। বড় ব্যবসায়ীদের এতে তেমন সমস্যা না হলেও তারা অস্বস্তি বোধ করছেন। ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ কিছুই না পেয়ে। মহামারি করোনাভাইরাস সংকটে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ চেয়ে পদে পদে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

আরিফুল ইসলাম (বার্তা সম্পাদক)
             “দ্যা নিউ স্টার”