রক্তদিয়ে মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচায় ‘ব্লাড ব্যাংক অব নকলা’

প্রকাশিত: ৩:০৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০
0Shares

মো. মোশারফ হোসাইন, শেরপুর প্রতিনিধি:

সর্ববৃহৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে শখের বসে একটি পেইজ খোলার মধ্যদিয়ে আত্ম প্রকাশ করা ‘ব্লাড ব্যাংক অব নকলা’ নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ‘মানবতার শ্রেষ্টদান, স্বেচ্ছায় করি রক্ত দান; হাসবে রুগি বাঁচবে প্রাণ, রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচান’ এ স্লৈাগান মনে প্রাণে ধারন করে ২০১৬ সালের ৯ জুন আনুষ্ঠানিক ভাবে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এর পর থেকে প্রায় প্রতিদিন দুর্ঘটনায় আহত, থ্যালাসেমিয়া, ক্যান্সার, প্রসূতি, রক্ত শূণ্যতা, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে এ সংগঠনের সদস্যদের স্বেচ্ছায় রক্ত দানের সেবা নিয়ে শত শত মানুষ সুস্থ্য হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন।

এ সংগঠনের শুরু থেকে স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের স্বেচ্ছায় রক্ত দানসহ বিভিন্ন জনসেবা মূলক কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে উপজেলার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের সাথে তথা এ সংগঠনে যোগ দিচ্ছেন। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সংগঠনটির সদস্য সংখা ও সুনামের পরিধি। সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের মহৎ ও প্রধান কাজ রক্ত দানের ডোনারের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। তাদের এ মহৎ কাজ দেখে উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ উপজেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানগন, পৌর সভার মেয়র ও কমিশনারগন, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়রম্যান ও সদস্যগনসহ সমাজের সুশীল নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা নিয়মিত পরামর্শ সহায়তা দিয়ে আসছেন।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন মূখ্য পরিচালক বর্তমান সভাপতি রাকিবুল হাসান রাজু জানান, গুরুতর অসুস্থতাকালীন সময়টা যেকোন মানুষের জন্য সবচেয়ে দুঃসময়। গুরুতর অসুস্থ অনেকের জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন হয়। মুমূর্ষু রোগীদের জন্য চিকিৎসকরা যখন রক্ত দেওয়ার কথা বলে, তখন রোগীর লোকজন মহাবিপদে পড়ে যান, তারা স্বাভাবিক কারনেই দিশেহারা হয়ে পড়েন। যথেষ্ট টাকা পয়সা থাকলেও প্রয়োজনীয় রক্ত মেলানো কঠিন হয়ে ওঠে। মিলানো যায় না নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্ত। সবসময় সব স্থানে প্রয়োজনীয় গ্রুপের রক্ত পাওয়া যায় না, মিলেনা রক্তের ডোনার। তাছাড়া রক্ত বিক্রির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে সব গ্রুপের নিরাপদ রক্ত পাওয়াটাও চিন্তার বিষয়। আবার অনেক জেলা-উপজেলায় রক্তের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ব্লাড ব্যাংক নেই। তাই তাদের সেবা গ্রহীতার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে এবং সেবা দানের কর্ম পরিধিও বাধ্য হয়েই বাড়াতে হচ্ছে তাদের।

তিনি আরও জানান, সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন ২/১ জন রোগীকে স্বেচ্ছাসেবকরা বিনামূল্যে রক্ত দান করে আসছেন। প্রতিষ্ঠার চার বছরের মধ্যে হাজার খানেক রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে সুস্থ্য করে তুলেছেন ওরা। তারা সকলে প্রতিদিন ১ থেকে ২ ঘন্টা ডোনারের ডাটা সংগ্রহে ব্যয় করেন। তাদের হাতে রোববার (১১ জুলাই) পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রুপের অন্তত শতাধিক রক্ত দাতা প্রস্তত করা আছে। বর্তমানে তাদের ফেইসবুক গ্রুপে বন্ধুর সংখ্যা ৫ হাজারেরও অধিক।

করোনা ভাইরাস সংক্রমনের শুরু থেকে যে বা যারা বুক চিতিয়ে মহামারির বিরুদ্ধে লড়ছেন, ব্লাড ব্যাংক অব নকলার স্বেচ্ছাসেবক সদস্যরা তাদের মধ্যে অন্যতম ভুমিকা পালন করছেন। করোনা ভাইরাস বাংলাদেশ আসার পরপরই তারা সকলে আরও তৎপর হয়েছেন। কারন হিসিবি তারা জানান, করোনার ভয়ে যেকোন মানুষ সহজে কোথাও যেতে নারাজ। এমতাবস্থায় তারা মুমূর্ষু রোগীদের বিনামূল্যে রক্ত দিয়ে সুস্থ্য করে তুলছেন। এ যেন পরম তৃপ্তি বলে তাদের অনেকে জানান। চলমান ক্রান্তীকালে তাদের সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকরা অর্ধশত রোগীকে বিনামূল্যে রক্ত দিয়েছেন। এছাড়া তারা এ পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্যাম্পেইন করে কয়েক হাজার মানুষের বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করেছেন। আর বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে তার নামসহ পূর্ণ ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও রক্তের গ্রুপ তাদের রেজিস্টার খাতায় লিখে রাখেন। প্রয়োজন মতো এদের মধ্যে আগ্রহীদের কাছ থেকেও রক্ত নেওয়া হয় বলে তারা জানান।

ব্লাড ব্যাংক অব নকলার সক্রিয় সদস্য সাব্বির আলম প্রান্ত, রাকিবুর রহমান রাকিব, আসিফ আলম চমক, স্বপন আহমেদ, মোজাহিদুল আলম, কৃষ্ণ প্রসাদ কালোয়ার, ফরিদ আহমেদ লালন, মোস্তফা শাকুর পাভেল, এএসএম স্বপন মিয়া, মো. মোশারফ হোসাইন, মহিউজ্জামান মিথুন, আরিফ জামান, মবিক হোসেন মামুন, আব্দুল্লাহ আল আমিন, ডা. কাওসার আজাদ শুভ্র, এএস মারুফ অনিক মোহাম্মদ বিন কাশেম, ফারিয়া ফেরদৌস কর্নেলিয়া, ফজলে রাব্বী রাজন, আরিফুর রহমান, ইমরুল কায়েস রিজন, রাকিবুল হাসান নাঈম, মিনহাজ আল আবেদীন, এএসএম সিফাত, আতিকুর রহমান মাসুম, রাজিব হাসান, রাকিবুল হাসান নিশাত, মেহেদী হাসান সজীব, হাসিবুল হাসান শান্ত, কাফি আল কায়েফ কানন, শামীম আহমেদ, নাসির উদ্দিন, আসাদুজ্জামান সৌরভ, লিংকন, রিফাত, সুজন, জিহাদ, রাইসুল ইসলাম রিফাত, শাহীন, অনিক সরকার, জান্নাত নাঈম লিয়ন, নাসিম হক, ফাহাদ, সাদিদুল আবিদ সৈকত ও নাজমুল হাসান প্রত্যয় চন্দ্র শীলসহ অনেকে জানান, নকলার অনেক রোগী সড়ক দুর্ঘটনা, থ্যালাসেমিয়া, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে রক্ত শূন্যতায় প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছেন এমন খবর দেখে ও শুনে তাদের মনে নাড়া দিয়ে ওঠে। অবশেষে প্রায় ৫ বছর আগে কোন এক ঈদের ছুটিতে এসে প্রথমে তারা কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নেন যে, নকলায় রক্ত দানে আগ্রহীদের নিয়ে ব্লাড ব্যাংক নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠান কার যায় কি-না। এরপর সকলের সম্মতিতে ব্লাড ব্যাংক অব নকলা নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন তারা। সিদ্ধান্ত মোতাবেক যথারীতি কাজ শুরু হয়। এরপর তাদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রথম দিকে নিক আত্মীয় বা আশপাশের কারও রক্তের প্রয়োজন হলে তারা মানুষকে নানাভাবে উৎসাহিত করে নিজেদের উদ্যোগে রোগীদের সাহায্য করতে থাকেন। এমন সেবা দিতে পেরে নিজেদের মধ্যে ভালো অনুভব হয়। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন মহলের দেওয়া উৎসাহে তারা খুব বেশি উৎসাহিত হতে থাকেন। তাদের কাজের পরিধি বাড়ানোর জন্য রক্তের ডোনার গ্রুপ তৈরি করতে ফেইসবুকে ‘ব্লাড ব্যাংক অব নকলা’ নামে একটি আইডি ও একটি গ্রুপ খোলেন। তাতে বাড়তে থাকে আগ্রহী রক্ত দাতার সংখ্যা। ফেইসবুকে রক্ত দাতারা নাম-ঠিকানাসহ মোবাইল নম্বর লিখে পোস্ট দেওয়া শুরু করেন। তাছাড়া কারও রক্তের প্রয়োজন হলে রোগীর রক্তের গ্রুপ, নাম, ঠিকানা, রোগের ধরন, রক্তের নামানোর স্থান ও মোবাইল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ফেইসবুক আইডি ও গ্রুপে পোস্ট করে দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষনের মধ্যে আগ্রহী রক্ত দাতা যথাসময়ে নিদৃষ্টস্থানে গিয়ে হাজির হন। আর সম্ভব না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই রক্তের প্রয়োজন রোগীর আত্মীয়দের জানিয়ে দেওয়া হয়। তাদের নিজস্ব অর্থায়নে সংগঠনের ৪র্থ বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষ্যে ২০১৯ সালে সেরা রক্তদাতা এবং রক্তদান ও মানবতার কল্যাণে বিশেষ অবদান রাখার জন্য অন্তত ৩৪ জনকে সম্মাননা স্মারক হিসেবে ক্রেস্ট প্রদান করাসহ ২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে কোন প্রকার অনুষ্ঠান ছাড়া ৫ম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে উপজেলার ৫টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে ও ৫জন বিশিষ্ট জনকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

রক্ত নিয়েছেন এমন অনেক রোগীর আত্মীয়রা জানান, রক্ত কিনে শরীরে দেওয়ার অনেকের সামর্থ্য থাকেনা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা যে মহৎ উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন, সে জন্য তাদের কোন কিছু দিয়ে বিনিময় করতে চাইলে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে।

নকলা পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান লিটন বলেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া নকলার যেসব ছেলে-মেয়েরা নিজ উদ্যোগে ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে তাদের এমন কাজকে মূল্যায়ণ করে শেষ করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মহতী উদ্যোগের ফলে যে পরিমাণ মানুষের উপকার করা হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে এটা একটা তুলনাহীন কাজ। তাদের এ কাজে সার্বিক সহযোগিতা করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব বলে তিনি মনে করেন।

উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ মো. বোরহান উদ্দিন ও ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সারোয়ার আলম তালুকদার বলেন, ব্লাড ব্যাংক অব নকলার স্বেচ্ছাসেবকদের স্বেচ্ছায় রক্তদানের কাজটি নি:সন্দেহে সর্বোচ্চ ইবাদতের শামিল। তাদের যেকোন প্রয়োজনে উপজেলা পরিষদ থেকে বিধিমাতাবেক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন তাঁরা।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম জিন্নাহসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক রফিকুল ইসলাম সোহেল, যুগ্ম আহবায়ক এফএম কামরুল আলম রঞ্জু ও রেজাউল করিম রিপনসহ অন্যান্য সদস্যরা জানান- দলীয় অনেক নেতাকর্মীদের পক্ষে যে কাজটি করা সম্ভব হয় না, এ কাজটি ব্লাড ব্যাংক অব নকলার স্বেচ্ছাসেবী সদস্যরা করছেন। তারা ছোট হলেও তাদের কাজটি অনেক বড় মানের বলে তারা আখ্যা দেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদুর রহমান জানান, দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ব্লাড ব্যাংক অব নকলার মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা হলে, কোন রোগী রক্তের অভাবে মারা যাবেন না। তাই জনস্বার্থে হলেও প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে সব পেশা শ্রেণীর লোকদের এগিয়ে আসতে অনুরোধ জানান তিনি। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস জনিত ঘোর ক্রান্তিকালে কোভিট-১৯ এর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ব্লাড ব্যাংক অব নকলার স্বেচ্ছাসেবকরা মুমূর্ষু রোগীদের রক্ত দিয়ে প্রমান করেছেন মানুষ মানুষের জন্য এই প্রবাদটি শতভাগ সঠিক।