মানবিকতাই মানুষের প্রকৃত ধর্ম তা আবারও প্রমান করলেন নকলার ইউএনও জাহিদুর রহমান

প্রকাশিত: ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২০
0Shares

মো. মোশারফ হোসাইন, শেরপুর প্রতিনিধি:

আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে, কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে, পাহাড় শিখায় তাহার সমান হই যেন ভাই মৌন-মহান; এমন সকল উক্তি বা কবিতার লাইনের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও লেখকদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিশ্বের অনেকে সাধারণ জনগনের কাছে মহান ব্যক্তির খ্যাতাব অর্জন করেছেন। আর এ ধারা অব্যাহত আছে বলেই বিশ্বের অনেক মানুষ অন্যের স্বেচ্ছা সহায়তা পেয়ে সুস্থ্যতার সহিত সুন্দর ভাবে জীবন যাপন করছেন। ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে’ কিংবদন্তি শিল্পী ভূপেন হাজারিকার গানের এই কথাগুলো যে কত সত্যি, তা আবার প্রমাণ করলেন শেরপুরের নকলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদুর রহমান। তিনি এর আগে করোনা কালীন ক্রান্তীকালে কাজের মাধ্যমে প্রমান করেছেন যে, তিনি একজন মানবিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এবার এক শিশুকে রক্ত দিয়ে আবারও প্রমাণ করলেন মানবিকতাই মানুষের প্রকৃত ধর্ম।

ইউএনও স্যারের শরীর থেকে ‘বি’ পজেটিভ রক্ত পেয়ে থ্যালাসেমিয়া রোগী জান্নাতুল মাওয়ার মুখে হাসি ফুটে ওঠেছে। তার চোখে-মুখে সুস্থতার সহিত বেঁচে থাকার আকুতি। জান্নাতুল মাওয়া দেখছে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, আর তার বাবা-মাসহ আত্মীয় স্বজনরা ভাবছেন তার ভবিষ্যত নিয়ে। ইউএনও স্যারের রক্ত পেয়ে তাদের মুখেও তৃপ্তিমাখা কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটে ওঠেছে। নকলা হাসপাতালের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট আবু কাউসার বিদ্যুত ইউএনও জাহিদুর রহমান স্যার এর শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে শিশু জান্নাতুল মাওয়ার হাতে তুলে দিলে তার চোখে-মুখে তৃপ্তির ছাপ ফুটে ওঠে।

শনিবার শেষ বিকেলে উপজেলার পাঠাকাটা এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ছয় বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন। ব্লাডব্যাংক অব নকলা ও শিশুটির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জান্নাতুল মাওয়া নকলা শহরের লাভা এলাকার মমিন মিয়ার মেয়ে। সে লাভা এলাকার স্থানীয় একটি ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মমিন ঢাকার কুর্মিটোলায় আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্য হিসেবে কর্মরত।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জান্নাতুল মাওয়া থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়। তার রক্তের গ্রুপ ‘বি’ পজিটিভ। এরপর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতি মাসে তার শরীরে রক্ত দিতে হচ্ছে। জান্নাতুল মাওয়ার জন্য প্রতি মাসে রক্ত সংগ্রহের কাজে সহযোগিতা করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্লাডব্যাংক অব নকলা ও বিডি ক্লিন নকলা নামে দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠন দুটি চলতি মাসের রক্তের জন্য অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ও তাদের ফেইসবুক গ্রুপে চাহিদা জানান দেন। কিন্তু রক্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এতে শিশু জান্নাতুলের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। একপর্যায়ে বিষয়টি জানতে পারেন ইউএনও জাহিদুর রহমান। তাঁর রক্তের গ্রুপও ‘বি’ পজিটিভ। এরপর এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি জান্নাতুলের জন্য রক্তদানে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ইউএনও জাহিদুরের এমন আগ্রহে সংগঠন দুটি ও শিশুটির পরিবারের সদস্যরা আশার আলো দেখেন। এরপর শনিবার শেষ বিকেলে উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ইউএনও জাহিদুর রহমান শিশু জান্নাতুলকে এক ব্যাগ রক্ত দান করেন।

ইউএনও জাহিদুর রহমান স্যার রক্ত দান করার সময় সকল স্বাস্থ্য বিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বিডি ক্লিন নকলা টিমের সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আল আমিনসহ বিডি ক্লিন নকলা টিম ও ব্লাড ব্যাংক অব নকলার সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবী সদস্য ফজলে রাব্বি রাজন, রাকিবুর রহমান রাকিব, সাব্বির আলম প্রান্ত, নাহিদুল ইসলাম রিজন, মইনুল হক অনিম, এ.এস.এম সিফাত, মিনহাজ আল আবেদিন, রাইসুল ইসলাম রিফাত, জান্নাতুল মাওয়ার মা ফারজানা বেগমসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। জান্নাতুল মাওয়ার মা ফারজানা বেগম জানান, ‘ইউএনও স্যার আমার মেয়েকে রক্ত দিয়েছেন। এ জন্য আমরা খুব খুশি ও তাঁর কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। আল্লাহ তাঁর মঙ্গল করুন।’ ইউএনও জাহিদুর রহমান জানান, ছাত্রজীবনে তিনি ৩ বার রক্ত দিয়েছিলেন। তবে ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও চাকরিজীবনে রক্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি। চাকরিজীবনে তিনি এই প্রথম রক্ত দিলেন। একটি শিশুর জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে তাকে রক্ত দিতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছেন ইউএনও জাহিদুর রহমান। থ্যালাসেমিয়া রোগী ৬ বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল মাওয়ার দ্রুত রোগ মুক্তির জন্য তার বাবা-মা ও নিকট আত্মীয় স্বজনরা সকলের কাছে দোয়া কামনা করেছেন।