‘তেঁতুলিয়ায় ইলিশের আকাল’ জেলেরা হতাশ

প্রকাশিত: ৬:৫৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২০
10 Views

এম.নাজিম উদ্দিন,পটুয়াখালী:
’হারা দিন ঘাটে বইয়্যা কাটাই, বাড়ি যামু কেমনে? বাড়ি গ্যালে বউ-পোলাপানের লইগ্যা চাউল-ডাইল নেওয়া লাগবে। মহাজনের কাছ দিয়া বহু ট্যাহা(টাকা) দাদন আইন্যা নদীতে গেছিলাম। কিন্তু যে মাছ পাইছি তা দিয়া ত্যাল(জ্বালানি) আর খাওন খরচ ও ওঠে নাই। বউ-বাচ্চারা চাইয়্যা রইছে,কী যে করমু কইতে পারিনা।এমন করেই নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলছিলেন পটুয়াখালী বাউফলের চর চরকচুয়ার জেলে আবুল কালাম। উপজেলার চরওয়াডেল,চরমিয়াজান,চররায়সাহেব,চরদিয়ারা কচুয়ার প্রায় অর্ধশত মাছ ধরার ছোট নৌকা ও ট্রলার তেঁতুলিয়া নদীর ঘাটে বেধে অলস সময় কাটাচ্ছে অনেক মাঝি। মৌসুমের শুরুতে সাগর ও নদ-নদীতে ইলিশ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে বাউফলের অসংখ্যক জেলে। জেলে হাশেম গাজী জানায়, গত ১০বছরের মধ্যে নদীতে মাছের এমন আকাল তার দেখিনি। বৈশাখের শুরুতে মহাজনের কাছ থেকে দাদন ও ধার-দেনা করে জাল-নৌকা ঠিকঠাক করে নদীতে গেছি বেশ কয়েক বার। কিন্তু আশানারূপ ইলিশ পায়নি। তার ওপর জলদস্যুদের হামলা,চাঁদাবাজি ও অপহরণ তো আছেই। তেতুলিয়া নদীতে ২০ বছর ধরে ইলিশ ধরার কাজ করছেন চরমিয়াজানের জেলে কাদের আলী। তিনি জানায়, বৈশাখ থেকে আষাঢ় শ্রাবন মাস পর্যন্ত এত্তো মাছ জালে ধরা পড়ত যে মোরা জাল জাগাইয়্যা ওপরে উঠাইতে পারতামনা। প্রায় জাল কাইট্রা নদীতে ভাসাইয়্যা দেতাম।“কিন্তু এহন হেই সব কথা গল্পের মতো হুনায়”।
কালাইয়া ঘাটের আড়তদার ওহাব শিকদার বলেন, মৌসুমের শুরুতে ইলিশ ধরা না পড়ায় আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।’তিনি বলেন,ইলিশ মৌসুমকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা এ খাতে প্রায় অর্ধকোটি টাকা লোকশান করেছে। জেলেরা এখন দুচিন্তার মধ্যে আছেন। কালাইয়া বন্দরের আড়তদার বাদল হোসেন জানায়,নদীতে ইলিশ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসছে জেলেরা। যেসব জেলে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়েছে, তারা এখন বিপদে পড়েছে।
সরকারি তথ্য মতে, উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ কেশাবপুর ধুলিয়া নাজিরপুর ও দাশপাড়ার কিছু অংশের মোট ৫হাজার ১শ’ ৫৫জন মানুষ জেলে পেশায় জড়িত। মাছ ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। তবে বেসরকারি হিসাবে নদী বেষ্ঠিত ইউনিয়ন চন্দ্রদ্বীপের প্রায় ২৩হাজার জনসংখ্যার প্রায় ৮৫শতাংশ মানুষ’ই জেলে। এছাড়াও কেশাবপুর ধুলিয়ার নদী তীরের অধিকাংশ মানুষই জেলে। এখানকার মানুষ নদী মাছ একে অপরের সুখ দু:খের সাথি। সাগরে অবরোধ আর নদী মাছ শূণ্য থাকায় তাদের দুর্দিন চলছে। ইলিশের ডিম ছাড়ার ২২দিন, মাছ বড় হওয়ার জন্য ২৪০দিন আর সাগরে মৎস্য সম্পদ রক্ষায় ৬৫দিন নিয়ে বছরে মোট ৩২৭দিন অবরোধ। তার সাথে আবার তেতুলিয়া ১০০ কিলোমিটার ইলিশের অভয়াশ্রম হিসাবে চিহিৃত। তাতে মাছ ধরা নিষেধ একমাস। এযেনো সারা বছরই অবরোধ। অপরদিকে, জেলে মানেই ঋণের জাল। বাউফলের প্রতিটি জেলেই বইছে চড়া সুদে এনজিওর কিস্তির জ্বালা। ঋণ তো নিতে হবেই। না দিলে তো সাবার (নৌকা, জাল) হবে না। পেটও চলবে না। শুধু ঋণই না। জড়িয়ে আছে দাদন জালেও। অবরোধ চলা কালে দাদনের টাকায় সংসার চলে। সেই টাকাই হয়ে উঠে কাল। ঋণে জড়জড়িত হওয়ার প্রধান কারন হিসাবে জানা যায়,বছরে কয়েক দফায় তাদের শেষ সম্বল জাল খোয়া যায়। কখনো নদী আবার কখনো নৌ-পুলিশ, পুলিশ আর কোস্ট গার্ড। আবার কখনো জলদস্যূরা হানায়। পুনরায় জাল করতে নিরুপায় জেলেরা ঝুকে পরে ঋণে আর মহাজনের দাদনে। চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের জেলে শ্রমিক রাজিব, সোহেল, হাসান ও সাকিব জানায় তাদের কষ্টের কথা। তাঁরা বলেন, ‘৮ থেকে ১০ হাজার টাকা মাসিক বেতনে কাজ করেন। কয়েক মাস নদীতে মাছ নেই। মালিক বেতন দিতে পারছে না। খুব কষ্টে দিন কাটছে তাদের । জেলে ট্রলারের মালিক তোফাজ্জেল ব্যাপারী বলেন,‘ সাগরে এক ট্রিপ মাছ ধরতে গেলে প্রায় ১লাখ টাকা খরচ হয়। অনেক সময় লাভ হয় আবার কখনো খরচ উঠে। এখন সাগরে মাছ নেই। তাই ডাঙায় বসে সময় পাড় করছি। তিনি সরকারের কাছে তাদের জন্য অল্প সুদে ঋণের দাবী করেন। আরেক জেলে সবুজ খাঁন বলেন,‘ ব্যাংক লোন আর মহাজনের দাদন নিয়ে সাবার (জাল-ট্রলার) করছি। এখন নদীতে মাছ নেই। লোনের কিস্তি দিতে পারছি না। আরেক জেলে সোবাহান মাঝি বলেন, গত বছর তিন সাবার জাল নৌ পুলিশে নিয়ে গেছে। আমি নি:শ হয়ে গেছি। তিনি আরো বলেন, পুলিশ জাল নিয়া কখনো পুড়ে ফেলে আবার কখনো অন্য কোন জেলের কাছে কম দামে বিক্রি করে। এছাড়াও তাদের চাঁদা দিতে হয়। কেশাবপুর ইউনিয়নের জেলে রহমান বলেন, ‘নদীতে মাছ ধরতে পারি না। ভোলার এক ডাকাত আমাদের জাল নিয়ে যায়। চাঁদার টাকারর জন্য টর্চার করে।
কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. সোহাগ বলেন,‘জলদস্যুদের হামলা থেকে জেলেদের রক্ষা করতে আমরা নদীতে নৌঁ পুলিশের টহল অব্যাহত রেখেছি। পূর্বের তুলনায় বাউফলের নদী সীমানায় তেমন ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। জেলেদের হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন,‘ কালাইয়া নৌঁ পুলিশ ফাঁড়ির কোন সদস্য এমন কাজের সাথে জড়িত না।
বাউফল উপজেলা সহকারি মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন,‘ নদী ও সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকাকালীন সময় সরকার জেলেদের খাদ্য সহায়তা দিয়ে থাকে। প্রকৃত জেলে সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,‘ নতুন করে জেলেদের তালিকা হালনাগাদ চলছে। যে সব জেলে মারা গেছে, অন্য পেশায় চলে গছে তাদের বাদ দিয়ে নতুন করে প্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্ত করা হবে।